যে কণ্ঠ একসময় কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে, সেই কণ্ঠ থেমে গেল চিরতরে। রোববার (৩১ মে) সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের লোখান্ডওয়ালায় নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ভারতীয় সংগীতের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সুমন কল্যাণপুর। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। বার্ধক্যজনিত শারীরিক জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন তিনি। ইন্ডিয়া টুডে এই খবর নিশ্চিত করেছে।
তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও লেখক মঙ্গলা খাদিকর পিটিআইকে জানান, রোববার রাত ৮টার দিকে শান্তিপূর্ণভাবেই মারা গেছেন সুমন কল্যাণপুর। জীবনের শেষ দিনগুলোতে নিজেরই গাওয়া গান শুনে সময় কাটাতেন এই শিল্পী। মঙ্গলা খাদিকর তার জীবনী নিয়ে মারাঠি ভাষায় ‘সুমন সুগন্ধ’ বইটি লিখেছেন।
১৯৩৭ সালে তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন সুমন কল্যাণপুর। জন্মসূত্রে বাঙালি নন, শিকড় কর্নাটকে। তার আসল পদবি ‘হেমাডি’। বাবা শঙ্কর রাওয়ের চাকরির সুবাদে পরিবার দীর্ঘদিন ঢাকায় ছিল। দেশভাগের পর মুম্বাইয়ে চলে যান, সেখান থেকেই শুরু হয় তার অসাধারণ সংগীত জীবন। হিন্দি, মারাঠি, বাংলা, ওড়িয়াসহ একাধিক ভাষায় অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন তিনি।
ছয় দশকেরও বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে ‘আজকাল তেরে মেরে প্যায়ার কে চর্চে’, ‘না না করতে প্যায়ার তুমহি সে’, ‘তুমনে পুকারা অউর হাম চলে আয়ে’, মোহাম্মদ রফির সঙ্গে ‘না তুম হামে জানো’ থেকে শুরু করে বাংলা গান ‘মনে করো আমি নেই, বসন্ত এসে গেছে’, এসব গান আজও শ্রোতাদের কাছে সমান প্রিয়। মারাঠি গান ‘কেটাকিচ্যা বনি তিথে’, ‘সাং কাধি কলনার তুলা’ ও ‘নিম্বোনিয়াচ্যা ঝাডামাঘে’ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে আসছে। তার কণ্ঠ প্রায়ই লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতেন শ্রোতারা, এমনকি লতার সঙ্গে দুটি যুগলবন্দি গানও রেকর্ড করেছেন তিনি। ২০২৩ সালে ভারতীয় সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন সুমন কল্যাণপুর।
তার প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমেছে ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীস বলেন, সুমন কল্যাণপুরের মৃত্যু ভারতীয় সংগীতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি এবং তার গান প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে। এনসিপির শরদ পাওয়ার বলেছেন, তার মৃত্যুতে ভারতীয় ধ্রুপদি ও হালকা সংগীতের একটি স্বর্ণালি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। ডেপুটি মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে তাকে ভারতীয় সংগীতের সোনালি যুগের প্রতীক বলে অভিহিত করেছেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিতিন গড়কড়ি এই মৃত্যুকে ভারতীয় সংগীতের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বলে উল্লেখ করেছেন।
শিল্পী চলে গেছেন, কিন্তু তার অমর সুর বেঁচে থাকবে কোটি শ্রোতার স্মৃতিতে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।