জানা নিউজ

এনআইডি সংশোধন: বছরে ১০ লাখ মানুষ ঘুরছে ইসির দরজায়

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের লক্ষ্যে প্রতি বছর নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দরজায় দরজায় ঘোরে ১০ লাখ মানুষ। দিনে এই সংখ্যা দেখা যায় প্রায় তিন হাজার।

 

জানা গেছে, নানা কারণে এনআইডিতে ভুল সংশোধনে এসব নাগরিক কখনো উপজেলা, কখনো জেলা, আবার কখনো আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে দৌঁড়াচ্ছেন। কাউকে কাউকে আসতে হচ্ছে ঢাকার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে।

এদের মধ্যে অনেকে ঘুরছেন মাসের পর মাস। কেউ কেউ আবার বছরের পর বছর ঘুরছেন।
পঞ্চাশোর্ধ্ব মো. মহসীন আলীর সঙ্গেই কথা হলো নির্বাচন ভবনে। ফরিদপুরের বাসিন্দা এসেছেন মায়ের তথ্য সংশোধনে।

উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকে তাকে ঢাকায় আসতে বলা হয়েছিল। সেজন্য নির্বাচন ভবনে কয়েকদিন এসে কোনো কূলকিনারা পাননি। অবশেষে একজন কর্মকর্তার কাছে তাকে ফের উপজেলাতেই যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। মহসীন আলী বলেন, প্রায় বছরখানেক ধরেই ঘুরছি।নির্বাচন কমিশনের তৈরি করা এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২ আগস্ট পর্যন্ত এনআইডি সংশোধনের মোট আবেদন জমা পড়েছে ৬৩ লাখ ৭৮ হাজার ৭৩০টি। যেহেতু এনআইডি সংশোধন কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চলমান, তাই ২০২০ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৬ বছর ৭ মাসে এই আবেদনগুলো জমা হয়েছে। এ হিসাবে বছরে গড়ে আবেদন পড়েছে প্রায় ৯ লাখ ৭০ হাজার। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের শুরু থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় বছরে এই আবেদনগুলো জমা হয়েছে। সে হিসাবে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৯ লাখ ৭০ হাজার এবং প্রতি মাসে গড়ে ৮০ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। দিনে আবেদন পড়েছে ২ হাজার ৭০০-এর মতো আবেদন।

জানা গেছে, এনআইডি সংশোধনের বিপুল চাহিদার মধ্যে নির্বাচন কমিশন অধিকাংশ আবেদন নিষ্পত্তি করেছে। মোট আবেদনের মধ্যে ৬২ লাখ ৩০ হাজার ৫৯২টি আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে, যা মোট আবেদনের প্রায় ৯৮ শতাংশ। এর মধ্যে ৪০ লাখ ৬১ হাজার ১৪৬টি আবেদন অনুমোদন করা হয়েছে।

অন্যদিকে, বিভিন্ন কারণে ১২ লাখ ৯৫ হাজার ৪৫৪টি আবেদন বাতিল বা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বর্তমানে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৮টি আবেদন বিভিন্ন পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, জন্মতারিখ, নাম, পিতা-মাতার নাম, ঠিকানা এবং অন্যান্য তথ্য সংশোধনের জন্য আবেদন বাড়লেও অনলাইন সেবা সম্প্রসারণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির কারণে দীর্ঘসূত্রতা আগের তুলনায় কমেছে।

এনআইডি সংশোধনের ৬৫ শতাংশ আবেদন ‘ক’ ক্যাটাগরিতে, সবচেয়ে কম ‘খ’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এনআইডি সংশোধনের জন্য মোট ৬৩ লাখ ৭৮ হাজার ৭৩০টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার এখতিয়ারভুক্ত (ক) ক্যাটাগরিতে জমা হয়েছে ৪১ লাখ ২৭ হাজার ৯৩৭টি আবেদন, যা মোট আবেদনের প্রায় ৬৫ শতাংশ। ফলে এই ক্যাটাগরিতেই সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা হয়েছে।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আবেদন জমা হয়েছে সিনিয়র জেলা বা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার এখতিয়ারভুক্ত (খ) ক্যাটাগরিতে। এ পর্যায়ে আবেদন সংখ্যা ১২ লাখ ৪৩ হাজার ৮৪৬। মোট আবেদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই ক্যাটাগরির আওতায় পড়েছে। এছাড়া আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার এখতিয়ারভুক্ত (গ) ক্যাটাগরিতে ৬ লাখ ২ হাজার ৭১৭টি এবং এনআইডি মহাপরিচালকের (ঘ) ক্যাটাগরিতে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪৮৮টি আবেদন জমা হয়েছে।

অন্যদিকে সহকারী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা (ক-১) ক্যাটাগরিতে আবেদন সংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭২ এবং অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার (খ-১) ক্যাটাগরিতে আবেদন সংখ্যা ১ লাখ ১০ হাজার ১০। সবচেয়ে কম আবেদন পড়েছে অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার এখতিয়ারভুক্ত খ-১ ক্যাটাগরিতে, প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ। এনআইডি সংশোধনের অধিকাংশ আবেদন মাঠপর্যায়ের উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এখতিয়ারভুক্ত (ক) ক্যাটাগরিতেই নিষ্পত্তির জন্য জমা হচ্ছে। বিপরীতে উচ্চতর পর্যায়ের কিছু ক্যাটাগরিতে আবেদন সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

এনআইডি সংশোধনের জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেশন প্রসিডিউর (এসওপি) অনুযায়ী, ক, ক-১, খ, খ-১, গ ও ঘ—এই ছয় ক্যাটাগরিতে আবেদন নিষ্পত্তি করে থাকে ইসি। এক্ষেত্রে আবেদনের জটিলতা অনুযায়ী ক থেকে ঘ পর্যন্ত ক্যাটাগরি নির্ধারিত হয়। আবেদন জমা পড়ার পর নির্দিষ্ট কর্মকর্তারা ক্যাটাগরি নির্ধারণ করে থাকেন।

ক-১ ক্যাটাগরি তথা, করণিক ভুল, স্বাক্ষরের পরিবর্তনের মতো আবেদনগুলোর জন্য সহকারী উপজেলা কর্মকর্তাকে নিষ্পত্তির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। মূল নাম ঠিক রেখে বানান ঠিক করার মতো আবেদনগুলো ক ক্যাটাগরিতে রাখা হয়, যা সংশোধনের ক্ষমতা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে।

আবার বানান পরিবর্তনের কারণে নাম পরিবর্তন হয়ে যায় এমন আবেদনগুলো খ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়। এসব আবেদন নিষ্পত্তি করেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। পুরো নাম পরিবর্তনের আবেদনগুলো গ ক্যাটাগরিতে নিষ্পত্তি করেন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা। ধর্ম পরিবর্তনের কারণে নাম পরিবর্তন বা শিক্ষাগত যোগ্যতা পরিবর্তনের মতো আবেদনগুলো খ-১ ক্যাটাগরিতে নিষ্পত্তি করেন অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। এদিকে খ ও খ-১ ক্যাটাগরিতে বাতিল আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করেন অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা। আর বয়স সংশোধনের আবেদন ঘ ক্যাটাগরিতে নিষ্পত্তির ক্ষমতা কেবল এনআইডি মহাপরিচালকের কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে।