বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আজ শুক্রবার অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত স্মরণসভায় বললেন, আমরা তো বরাবরই বলে এসেছি যে, আমরা সংবিধান সংশোধন করতে চাই। আমরা সংবিধান সংস্কারের কথা কখনই বলিনি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। এ নিয়ে বিরোধীদল জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।”
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা আজকে অনেকগুলো কথা প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি। আমাদের বিরোধীদল থেকে বলা হচ্ছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি সংসদে আদায় না হলে রাজপথের ফয়সালা হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য এ প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। জুলাই সনদে আমরা সই করেছি একসঙ্গে। যেসব দল আমরা আন্দোলন করেছি একসঙ্গেই তারা সই করেছি। জুলাই সনদে প্রতিটি অক্ষর আমরা বারবার করে বলছি যে আমরাই বাস্তবায়িত করবো। এটাতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।’গণভোট প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘যে গণভোটের কথা বলা হচ্ছে, সেই গণভোটের একটা অংশে তো আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনাই হয়নি। আমরা বারবার করে যে কথা বলতে চাচ্ছি যে, আমরা উচ্চকক্ষে আনুপাতিক হারে ভোটে যে প্রতিনিধিত্ব হবে সেই বিষয়টাতে আমরা কখনই একমত হইনি। সে সময়ে স্টেটমেন্ট দিয়েছিলাম আমি নিজেই যে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। সেই সংস্কার কমিশন-রিফর্ম কমিশন তারা যে কথাগুলো সেদিন যেভাবে নিয়ে এসেছেন আমাদের কনসেন্ট ছাড়া তারা নিয়ে আসছেন।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদের বইটা যদি আপনারা পড়েন সেখানে প্রতিটি জায়গায় বলা আছে যে, যে দল নির্বাচিত হবে তারা তাদের ম্যানিফেস্টো অনুযায়ী সেটাকে বাস্তবায়িত করবে। আমরা বারবারই এই কথা বলে এসেছি এবং উই আর কমিটেড। আমরা ৩১ দফাতে যেমন কমিটেড ঠিক তেমনিভাবে আমরা কমিটেড হচ্ছি জুলাই সনদ বাস্তবায়নে। কিন্তু সেটা আমরা যেভাবে চেয়েছি সেভাবে আমরা বলছি। এখানে বিরোধী দল সম্পূর্ণভাবে ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে যে, আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চাই না।’
জুলাই সনদ দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) কাকরাইলের আইডিবি ভবন মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতা বলেছিলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি সংসদে আদায় না হলে রাজপথে ফয়সালা হবে। গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সংবিধানে সংশোধনের নামে কোনো ভাঁওতাবাজি জনগণ মেনে নেবে না।’‘সংস্কার বিএনপিই এনেছে’
সংস্কার প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সংস্কারের কথা বলে। সংস্কার এদেশে কারা এনেছে? বিএনপি এনেছে। একদলের শাসন ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র বিএনপি নিয়ে এসেছে, প্রেসিডেনশিয়াল ফর্ম অব গভর্নমেন্ট থেকে পার্লামেন্টারি ফর্ম অব গভর্নমেন্ট বিএনপি নিয়ে এসেছে।’
তিনি বলেন, “আপনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে বিধান সেই বিধান আমরাই পার্লামেন্টে সারারাত কাজ করে আমরা পাশ করেছি। আজকে যখন এ সমস্ত কথাগুলো বলা হয় জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য বলা হয় বলে আমি মনে করি।
বিরোধীদলকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘এখন বিরোধী যারা আছেন তারা অনেকে বিভিন্ন রকম মুখরোচক কথা বলে জনগণকে উত্তেজিত করবার চেষ্টা করছেন।’তার ভাষায়, ‘জনগণের চেয়ে ভালো তো আর কেউ বোঝে না। আমরা যতই মনে করি, জনগণ কিন্তু সবচেয়ে ভালো বোঝেন। তারাই সেই সিদ্ধান্তটা সবচেয়ে ভালো নেবেন যে আমরা সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে কী বলেছি।’
তিনি বলেন, ‘জনগণ আমাদের যে ভোট দিয়েছে, ম্যানিফেস্টোর মধ্যে যেটা ছিল সেই ম্যানিফেস্টোতে আমরা টু থার্ড মেজরিটি নিয়ে বিএনপি আজকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। সুতরাং ওই জায়গায় কোনো রকমের বিভ্রান্তির অবকাশ আছে বলে আমি মনে করি না।’‘ক্ষমতায় যেতে জুলাই সনদকে ব্যবহার করতে চায়’
বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমি মনে করি যে, বিরোধী দল শুধু তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এই জুলাইকে (জুলাই সনদ) তারা ব্যবহার করতে চায়। আমরা কিন্তু চাই না যে জুলাই শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আরেকটা হাতিয়ারে পরিণত হোক।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যেটা বারবার করে বলে আসছি, যে জুলাইয়ের আন্দোলন শুধু ওই জুলাই মাসের আন্দোলন নয়। জুলাইয়ের আন্দোলন কিন্তু আমরা দীর্ঘকাল ধরে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রায় ১৮/১৯ বছর ধরে যে লড়াই হয়েছে সে লড়াইয়ের ফলশ্রুতি হচ্ছে আমাদের এই ’২৪-এর জুলাইয়ের আন্দোলন। সেই ফলশ্রুতিতে আমরা সেভাবে এসেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ডেমোক্রেসিতে থাকি। বিভাজনের রাজনীতি না করি। আমরা সবাই মিলে যেভাবে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন করেছিলাম, যুদ্ধ করেছিলাম, আমরা স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। আবার ’২৪-এ আমরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াই করে ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছি। এখন একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সবাই মিলে আমরা এটাকে যদি সেই জায়গায় নিয়ে যেতে পারি যেখানে আমাদের সেই লক্ষ্যে আমরা পৌঁছাতে পারব।’
সমস্যার সমাধান সহজ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সমস্যার সমাধান এত সহজ নয়, অত্যন্ত জটিল। এত সহজেই এতগুলো ক্লে চলে যাবে না, এত সহজেই আমরা মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত কিছুকে সুন্দর করে ফেলতে পারবো না।’
তিনি বলেন, ‘কিন্তু ধৈর্যের মধ্যে ধরে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আজকে প্রফেসর এমাজউদ্দিন আহমেদ সাহেবের আমরা বারবার সেই কথাই মনে করি যে, তার দেখানো পথ… তিনি যে পথে চলতে চেয়েছেন গণতন্ত্রের পথে, তিনি লিবারাল ডেমোক্রেসির পথে এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে সত্যিকার একটা ডেমোক্র্যাটিক কান্ট্রি গড়ে তোলার ব্যাপারে সেদিকে আমরা এগিয়ে যাব।’
যৌথভাবে এ স্মরণসভার আয়োজন করে প্রফেসর এমাজউদ্দিন আহমেদ রিসার্চ সেন্টার ও জাতীয় সাংবাদিক সমিতি।