জানা নিউজ

শেষ পর্যন্ত কিছু সম্পর্ক সম্পত্তির মতোই ভাগ হয়ে যায়!

সাহিত্য পাতা

শৈশবের উঠোনটা যেন ছিল এক নিজস্ব জাদুর রাজ্য—সেখানে ‘আমার’ বলে আলাদা কোনো পৃথিবী ছিল না; যা কিছু ছিল, সবই ছিল ‘আমাদের’। একই থালায় ভাত, একই কলসির পানি, একই কাঁথার নিচে গা ঘেঁষে রূপকথা শোনা ; অতি সামান্যতেই কত আনন্দ, কত হাসি, কত অভিমান; আবার একটু পরেই সব ভুলে পাশাপাশি বসে পড়া।
ভাই-বোনের সেই দিনগুলোতে ভালোবাসাকে কেউ মেপে দেখেনি, প্রাপ্যতার কোনো হিসাব কষেনি; একজনের আনন্দ অনায়াসেই অন্যজনের আনন্দ হয়ে উঠত, একজনের চোখের জল নীরবে এসে জমত অন্যজনের চোখেও। সম্পর্ক তখন কোনো প্রতিশ্রুতি বা অধিকারের ভাষা জানত না—ভালোবাসাই ছিল তার স্বাভাবিক ভাষা, আপনত্বই ছিল তার একমাত্র পরিচয়। তখন কে জানত, সময়ের স্রোতে একদিন সেই চেনা মুখগুলোর মাঝেও অচেনা দূরত্ব জন্ম নেবে।
কিন্তু সময় এক নির্মম ভাস্কর। সময় বদলায়, মানুষও বদলায়। যৌবনে পা রাখার পর যখন জীবনের সঙ্গে বাস্তবতার পরিচয় হয়, তখন চেনা আঙিনাটা ধীরে ধীরে ছোট হতে শুরু করে। মাথা তুলে দাঁড়ায় নিজস্ব চাহিদা, গড়ে ওঠে নিজ সংসার, জন্ম নেয় নতুন দায়বদ্ধতা। একসময় যে ভাই-বোনেরা ছিল একে অপরের ছায়া, এক অন্তরের বাসিন্দা, তারা ধীরে ধীরে আলাদা হাঁড়ি পাততে শেখে, পৃথক হয় তাদের দৈনন্দিন জীবন। যে উঠোন ছিল এক প্রাণে একসঙ্গে দৌড়ানোর মিলন-মাঠ, সেখানে একদিন আর সেই কোলাহল শোনা যায় না; যে ঘরে রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত গল্প চলত, সেখানে নেমে আসে দীর্ঘ নীরবতা। তবুও, যতদিন বাবা-মা বেঁচে থাকেন, ততদিন শিকড়ের টানটা কোনোমতে টিকে থাকে। বাবা-মায়ের উপস্থিতি যেন এক অদৃশ্য সুতো, যা বিচ্ছিন্ন হতে যাওয়া পুঁতিগুলোকে এক মালায় গেঁথে রাখে। অপ্রকাশিত এক মায়ায় সবাইকে একসঙ্গে বেঁধে রাখে।
আসল ভাঙনটা আসে তখন, যখন সেই বটবৃক্ষের পতন ঘটে। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর শূন্য হয়ে যাওয়া ঘরে যখন প্রথম প্রবেশ করে ‘সম্পত্তি’ নামের এক নীরব অথচ নির্মম বাস্তবতা, তখন সম্পর্কের চেনা সমীকরণগুলোও ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে। যে ঘরে একসময় মায়ের কণ্ঠে ভোর হতো, বাবার অপেক্ষায় সন্ধ্যা নামত, সেই ঘরের আলমারি, খাট, উঠোন, গাছ, জমি—সবকিছু একদিন হঠাৎ করেই হয়ে ওঠে হিসাবের বিষয়। কিন্তু মায়ের হাতের শেষ স্পর্শ, বাবার সঙ্গে কাটানো শেষ বিকেল, কিংবা একই ছাদের নিচে কাটিয়ে দেওয়া শৈশবের কোনো হিসাব থাকে না। কাগজে জমির সীমানা টানা যায়, ঘরের অংশ নির্ধারণ করা যায়; কিন্তু স্মৃতির কোনো সীমানা টানা যায় না।
মানুষ সম্পদের অভাবকে মেনে নিতে পারে; কিন্তু যে মানুষটির সঙ্গে অভাব ভাগ করে বেঁচেছিল, তার অনুপস্থিতিকে মেনে নেওয়া অনেক কঠিন।
আমরা অনেকেই পরিবারে এমন ট্র্যাজেডির নীরব সাক্ষী হয়েছি। শৈশবে বাবার সঙ্গে চাচার যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব চোখে পড়েছিল, সময়ের সঙ্গে তার অন্তর্নিহিত কারণগুলোও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আবার মায়ের মৃত্যুর পর মামাদের মধ্যেও কখনো দেখা যায় সেই চেনা মানুষগুলোর অচেনা রূপ। যে হাত একসময় পরম মমতায় মাথায় বুলিয়েছিল, পৈতৃক সম্পত্তি ভাগের টেবিলে সেই হাতই কখনো অধিকারের ছদ্মবেশে নিজের সীমানা বাড়াতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। যে কণ্ঠ একসময় আপনজনের খোঁজ নিত, সেই কণ্ঠেই কখনো শোনা যায় হিসাবের কঠিন ভাষা। তখন সেই টেবিল আর কেবল জমির দলিল গোছানোর জায়গা থাকে না; হয়ে ওঠে মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা অহমিকা, বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভ ও স্বার্থপরতার এক নির্মম আয়না।
সম্পর্কের কিছু দরজা বাইরে থেকে বন্ধ হয় না; মানুষের ভেতরের অভিমান, অহমিকা আর হিসাবই একদিন ধীরে ধীরে সেগুলো বন্ধ করে দেয়।
অন্যদিকে, আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় এই দ্বন্দ্বের আরও এক সূক্ষ্ম ও নির্মম দিক আছে। পৈতৃক সম্পত্তিতে বোনের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নটি সামনে এলে ‘বোন তো পরের ঘরের’—এই অলিখিত ধারণা কখনো কখনো ভাইদের মনোজগতে এমন এক স্বার্থপরতার জন্ম দেয়, যা সরাসরি অস্বীকারের ভাষায় নয়, বরং নানা কৌশল ও ছলনার আড়ালে প্রকাশ পায়। বোনকে তার প্রাপ্য থেকে দূরে রাখতে কখনো হিসাবের জটিলতা, কখনো সময়ক্ষেপণ, কখনো আবেগের চাপ—এমনকি ভালোবাসার আবরণও ব্যবহার করা হয়।
যে ভাই একসময় বোনকে আগলে রাখত, তার হাত ধরেই হয়তো একদিন বোন প্রথম হাঁটতে শিখেছিল; সেই হাতই সম্পত্তির হিসাবের কাছে এসে কখনো নিজের অজান্তে এমন এক ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে, যেখানে বোনের অধিকার কাগজে থাকলেও বাস্তবে তার নাগাল ক্রমশ দূরে সরে যায়। যে বোনটি একদিন ভাইয়ের হাত ধরে বাবার বাড়ির উঠোনে ঘুরে বেড়িয়েছিল, সেই বোনই হয়তো একদিন নিজের অধিকার চাইতে সেই বাড়ির দরজায় দাঁড়ায়—কিন্তু দরজাটি তখন আর আগের মতো আপন থাকে না। শৈশবের যে বাড়িতে তার জন্য আলাদা করে কোনো অধিকার দাবি করতে হতো না, সেখানে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে এসে নিজের অংশের জন্য তাকে প্রমাণ দিতে হয়। তখন সম্পত্তি শুধু ভাগ হয় না—ভাগ হয়ে যায় সম্পর্কের ভেতরের বিশ্বাসও।
তবে মানুষের জীবনের এই টানাপোড়েনই শেষ কথা নয়। জীবনের বেলাশেষে এসে, যখন বৈষয়িকতার সমস্ত মোহ গোধূলির আলোয় ফিকে হয়ে আসে, তখন মানুষ আবার তার আদি শিকড়ের সন্ধান করে। ভাইয়ে-ভাইয়ে কিংবা ভাই-বোনের কাছে আসার সেই পুরোনো আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে। মনে পড়ে সেই উঠোন, সেই ঘর, সেই মানুষগুলো—যাদের সঙ্গে একসময় সামান্য একটি খাবারও ভাগ করে খাওয়া যেত, কষ্টের জল দুজনের চোখে সমানে ভেসে উঠত। ফেলে আসা শৈশবের সেইসব স্মৃতিগুলো হয়ে ওঠে সমস্ত সম্পদের চেয়ে মূল্যবান। মানুষ তখন বুঝতে পারে—জীবনে যা কিছু অর্জন করেছিল, তার অনেকটাই ছিল বাহ্যিক; আসল সত্য লুকিয়ে আছে বিস্মৃত হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর অন্তর-আত্মায়।
মানুষ আসলে বাড়ি হারায় না, হারায় বাড়ির ভেতরে থাকা আপন মানুষগুলোকে। শেষ বয়সে এসে মানুষ অনেক সময় সম্পদের মূল্য দিয়ে নয়, হারিয়ে ফেলা মানুষগুলোর শূন্যতা দিয়ে নিজের জীবনের হিসাব করতে শেখে। তখন আর সম্পত্তির হিসাব নয়, মানুষ ফিরে পেতে চায় মানুষকে। ফিরে পেতে চায় সেই আপন সময়, যখন সম্পর্কের কোনো দলিল ছিল না, কোনো সীমানা ছিল না—ছিল শুধু আপন হয়ে থাকার সহজাত অধিকার। কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর বিচারক! কিছু দূরত্বের ওপারে আর কোনো প্রত্যাবর্তন থাকে না; শুধু থেকে যায় ফেলে আসা সম্পর্কের দীর্ঘ ছায়া। কেউ কেউ হয়তো সেই ছিন্ন সুতোয় আবার আপনত্বের মালা গাঁথতে পারে, কেউ আর পারে না। শেষ পর্যন্ত কিছু সম্পর্ক সম্পত্তির মতোই ভাগ হয়ে যায়!