মিজানুর বলেন, তাদের কোনো জমিজমা নেই। পরিবার চালাতে তার একটি সরকারি চাকরি প্রয়োজন। কিন্তু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় চাকরি পাওয়া কঠিন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে নিজের সমস্যার কথা জানানোর ইচ্ছার কথাও তিনি জেলা প্রশাসককে বলেন।
মিজানুরের কথা শুনে জেলা প্রশাসক তাকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তার মেয়েও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় পরিবারটির অসহায়ত্ব বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সঙ্গে কথা বলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মিজানুরের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবেন বলে জানান তিনি। মিজানুর চাইলে নিজ উদ্যোগেও তার জন্য চাকরির ব্যবস্থা করার কথা বলেন জেলা প্রশাসক।
গাজীপুর মহানগরের মাস্টারবাড়ি এলাকার রোকসানার (২৫) জীবনসংগ্রাম আরও কঠিন। তার বাড়ি বগুড়ায়। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে ট্রেনে কাটা পড়ে তার ডান পা এবং বাঁ হাতের তিনটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে পরিবার তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামায়।
বড় হওয়ার পর রোকসানার বিয়ে হয় এক রাজমিস্ত্রির সহকারী শ্রমিকের সঙ্গে। স্বামীর আয় ছিল অনিয়মিত। এর মধ্যে রোকসানা অন্তঃসত্ত্বা হন। সন্তান জন্মের আগেই প্রতিপক্ষের হামলায় তার স্বামী মারা যান। সন্তানকে মায়ের কাছে রেখে জীবিকার সন্ধানে গাজীপুরে এসে আবারও ভিক্ষাবৃত্তিতে নামতে হয় তাকে।
‘ডিসি স্যার গরিবের বন্ধু’—অন্যদের কাছ থেকে এমন কথা শুনে বুধবার জেলা প্রশাসকের কাছে যান রোকসানা। ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক জানান, রোকসানার জন্য গাজীপুরের কাশিমপুরে একটি বড় ও সুনামধন্য পোশাক কারখানায় তাৎক্ষণিক চাকরির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পূবাইলের হারবাইদ এলাকার বাসিন্দা শুক্কুর আলী (৪৩) দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। নিজের কোনো জমিজমা নেই। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অন্যের বাড়িতে থাকতেন। প্রায় দুই বছর আগে স্ট্রোক করার পর শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন। ফলে বন্ধ হয়ে যায় তার আয়-রোজগার।
শুক্কুর আলী জানান, তার দুর্দশা দেখে এক ব্যক্তি ঘর নির্মাণের জন্য কিছু জমি দিতে চেয়েছেন। কিন্তু ঘর নির্মাণের সামর্থ্য তার নেই। তাই জেলা প্রশাসকের কাছে একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার আবেদন করেন তিনি। তার আবেদন শুনে জেলা প্রশাসক ঘর নির্মাণের আশ্বাস দেন।
বুধবারের গণশুনানিতে মিজান, রোকসানা ও শুক্কুর ছাড়াও অর্ধশতাধিক মানুষ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আসেন। তাদের কেউ এসেছেন চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা চাইতে, কেউ গৃহসংকট, জমিজমা, বয়স্ক ভাতার কার্ড, ভাড়া না পাওয়া কিংবা এলএ বিলসংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে।
নিঃসন্তান ফিরোজা বেগম চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা চান। ক্যানসারে আক্রান্ত বিধবা নাজমা চিকিৎসার খরচের জন্য সহায়তা চান। বৃদ্ধ আবুল হোসেন মৃধা ভাঙা ঘর মেরামতের জন্য টিন চেয়েছেন। ভোগড়া থেকে বিল্লাল হোসেন অভিযোগ করেন, তার ভাড়াটিয়া দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া পরিশোধ করছেন না।
শ্রীপুর থেকে আসা আশরাফুল ইসলাম রয়েল এলএ বিল পেতে ঘুষ দাবির অভিযোগ করেন। প্রতিবন্ধী শিরিন বয়স্ক ভাতার কার্ডের আবেদন করেন। আমেনা বেগম জানান জমিসংক্রান্ত সমস্যার কথা। কলেজছাত্র ও এতিম ফাহিমসহ কয়েকজন আর্থিক সহায়তার আবেদন করেন। হোসনেয়ারা, আবদুর রহিম ও আবদুর রাজ্জাক চিকিৎসা সহায়তার আবেদন নিয়ে আসেন।
মৃত সাংবাদিক আবদুল মজিদের স্ত্রী তামান্না আফরোজা তার সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে নিতে সহযোগিতা চান।
গণশুনানিতে আসা প্রত্যেকের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন জেলা প্রশাসক। সমস্যার ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগও নেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের সমস্যার সমাধান করাই গণশুনানির মূল উদ্দেশ্য। সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন তারা। মিজানুর রহমান, রোকসানা ও শুক্কুর আলীর মতো মানুষের সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।