ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যুদ্ধের শুরুর দিকে বিমান হামলায় মুখ ও পায়ে পাওয়া গুরুতর আঘাত থেকে এখনো সেরে উঠছেন। যে হামলায় তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ তিনজন রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনটি সূত্রই জানিয়েছে, মধ্য তেহরানে সর্বোচ্চ নেতার বাসভবনে হামলায় খামেনির মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে গেছে এবং তার এক বা উভয় পায়ে গুরুতর আঘাত লেগেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের মতে, মোজতবা খামেনি তার আঘাত থেকে সেরে উঠছেন। তাদের মধ্যে দুইজন জানিয়েছেন, তিনি অডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। এ ছাড়া যুদ্ধ ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনাসহ প্রধান প্রধান বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সঙ্গে যুক্ত আছেন। গতকাল শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উচ্চ-পর্যায়ের শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরান এখন কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা রাষ্ট্রীয় কাজ পরিচালনার জন্য শারীরিকভাবে উপযুক্ত কি না? গত রোববার (৮ মার্চ) তার বাবার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনির কোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও রেকর্ডিং প্রকাশিত না হওয়ায়, তার অবস্থান, অবস্থা এবং শাসন করার ক্ষমতা জনসাধারণের কাছে এখনো অনেকাংশেই রহস্যই রয়ে গেছে। মোজতবা খামেনির আঘাতের মাত্রা বা কেন তিনি এখনো কোনো ছবি বা রেকর্ডিংয়ে উপস্থিত হননি, সে বিষয়ে রয়টার্সের করা প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয়নি ইরানের জাতিসংঘ মিশন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের প্রথম দিনের সেই হামলায় নিহত পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে মোজতবা খামেনির স্ত্রী, শ্যালক এবং শ্যালিকাও ছিলেন। মোজতবা খামেনির আঘাতের মাত্রা নিয়ে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। মোজতবা খামেনি আহত হওয়ার বিবরণ মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ১৩ মার্চের একটি বিবৃতির সাথে মিলে যায়। যেখানে তিনি বলেছিলেন, মোজতবা খামেনি আহত অবস্থায় আছেন। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, খামেনি একটি পা হারিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। খামেনির শারীরিক অবস্থা নিয়ে মন্তব্য করতে সিআইএ অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও প্রশ্নগুলোর জবাব দেয়নি। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো অ্যালেক্স ভাতানকা বলেছেন, তার আঘাতের তীব্রতা যাই হোক না কেন, নতুন ও অনভিজ্ঞ এই নেতার পক্ষে তার বাবার মতো সব ক্ষমতা আয়ত্ত করা সম্ভব হবে এমন সম্ভাবনা কম। ভাতানকা আরো বলেন, ‘যদিও তাকে ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে, তার পক্ষে একই স্তরের স্বতঃস্ফূর্ত কর্তৃত্ব গড়ে তুলতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। মোজতবা একটি কণ্ঠস্বর হবেন, কিন্তু সেটি চূড়ান্ত হবে না।’তিনি আরো বলেন, ‘তাকে বিশ্বাসযোগ্য, শক্তিশালী ও সর্বময় কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। শাসনব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কোন পথে এগোবে।’ ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি বলেছেন, এক থেকে দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ নেতার ছবি প্রকাশ করা হতে পারে এবং তিনি তখন জনসমক্ষে উপস্থিতও হতে পারেন। তবে তিনটি সূত্রই জোর দিয়ে বলেছে, তার স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলেই তিনি জনসমক্ষে আসবেন। ইরানের শাসনব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা থাকে সর্বোচ্চ নেতার হাতে। তাকে ৮৮ সদস্যের একটি পরিষদ নির্বাচন করে। তিনি দেশের প্রেসিডেন্টের ওপর নজরদারি করেন এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর মতো শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক বাহিনীকে সরাসরি নির্দেশ দেন। ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি। তিনি ছিলেন বিপ্লবের নেতা এবং খুব প্রভাবশালী ধর্মগুরু, তাই তার কর্তৃত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না। তার পরের নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি তুলনামূলকভাবে কম প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা ছিলেন, তবে তিনি আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৮৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে নিজের ক্ষমতা শক্তিশালী করেন, বিশেষ করে আইআরজিসির ক্ষমতা বাড়িয়ে। রয়টার্সের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, খামেনির ছেলে মোজতবা তেমনভাবে একক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন না। সূত্রগুলো জানায়, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসই (আইআরজিসি) বড় ভূমিকা রাখছে। খামেনির মৃত্যুর পর নতুন নেতা নির্বাচনে তারা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে এবং যুদ্ধের সময় কৌশলগত সিদ্ধান্তেও তাদের প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। ইরানের গার্ডস বাহিনী ও সম্ভাব্য নতুন সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও এ বিষয়ে জাতিসংঘে ইরানের মিশন কোনো মন্তব্য করেনি। কর্মকর্তা ও অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর মতে, খামেনির ছেলে মোজতবা আগে থেকেই তার বাবার দপ্তরের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে আইআরজিসির উচ্চ পর্যায়ের কাজে যুক্ত ছিলেন এবং শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। বিশ্লেষক ভাতানকা বলেন, আইআরজিসির সঙ্গে এই সম্পর্কের কারণে অনেকেই মনে করেন, তিনি তার বাবার কঠোর নীতি চালিয়ে যাবেন। তবে তার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে এখনো খুব বেশি কিছু জানা যায়নি। সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ইরানিদের উদ্দেশে খামেনেইয়ের প্রথম বার্তা আসে ১২ই মার্চ। একজন টেলিভিশন সংবাদ উপস্থাপকের মাধ্যমে পাঠ করা এক লিখিত বিবৃতিতে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখা উচিত। আঞ্চলিক দেশগুলোকে মার্কিন ঘাঁটিগুলো বন্ধ করে দেওয়ার জন্য সতর্কও করেন। এর পর থেকে তার দপ্তর থেকে তার পক্ষ থেকে আরো কয়েকটি সংক্ষিপ্ত লিখিত বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ২০ মার্চের বিবৃতিটিও রয়েছে। যেখানে তিনি ফার্সি নববর্ষকে স্বাগত জানান এবং একে প্রতিরোধের বছর হিসেবে আখ্যা দেন। ইরানের যুদ্ধকালীন অবস্থান, কূটনীতি, প্রতিবেশী, যুদ্ধবিরতি আলোচনা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বিষয়ে নীতিগত প্রকাশ্য বিবৃতি অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও দিয়েছেন।
খামেনি কোথায়?
ইরানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মেসেজিং অ্যাপের গ্রুপগুলোতে খামেনির অনুপস্থিতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। তার অবস্থা এবং কে দেশ চালাচ্ছে, তা নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া একটি জনপ্রিয় মিম হলো স্পটলাইটের নিচে একটি খালি চেয়ারের ছবি এবং সেখানে লেখা ‘মোজতবা কোথায়?’ তবে আইআরজিসি পরিচালিত স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক গোষ্ঠী বাসিজ মিলিশিয়ার একজন ঊর্ধ্বতন সদস্যসহ কিছু সরকার সমর্থক বলেছেন, মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার হুমকির কারণে তার নিজেকে আড়াল রাখাটা জরুরি। এসব হামলায় ইতিমধ্যে দেশের নেতৃত্বের একটি বড় অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অনেকে বলছেন, ‘সে কেন জনসমক্ষে আসবে? এই অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তু হতে?’