মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর দেশীয় সহযোগীদের তালিকায় তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল সংশোধন বিল সংসদে পাস হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এ নিয়ে আপত্তি তুললেও কণ্ঠভোটে বিলটি গৃহীত হয় এবং শেষ পর্যন্ত পাস হয়।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমদ আজম খান বিলটি উত্থাপন করেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার প্রস্তাব আনা হলে কণ্ঠভোটে তা গ্রহণ করা হয়। পরে দফাওয়ারি অনুমোদন শেষে বিলটি পাস হয়। একই সময়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি, এনসিপি, লিখিতভাবে স্পিকারকে জানায়, এ বিল নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
এই বিলের মাধ্যমে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন, ২০২২ সংশোধন করে মুক্তিযুদ্ধ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের সহযোগীদের সংজ্ঞা নতুনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সংজ্ঞার অংশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের সহযোগী শক্তি হিসেবে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের পাশাপাশি তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধই মুক্তিযুদ্ধ।
বিলটি পাসের আগে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সংসদে বক্তব্য দেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, “দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মানুষ একটি মানবিক রাষ্ট্র চেয়েছিল, যেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, কিন্তু বাস্তবে তার উল্টোটা হয়েছে।” তিনি অতীত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে একদলীয় শাসনব্যবস্থার সমালোচনাও করেন।
বিলের নির্দিষ্ট অংশ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নাম এভাবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করা আগে কোনো সরকার করেনি। তার ভাষায়, “আল্লাহ ভালো জানেন, ’৭১ সালের সেই চরম সময়ে কার কী ভূমিকা ছিল। আল্লাহই পূর্ণাঙ্গ সাক্ষী, আমরা বাকিরা আংশিক সাক্ষী।” একই সঙ্গে তিনি দেশের রাজনীতিতে বিভক্তি না বাড়ানোর আহ্বান জানান।
তবে স্পিকার পরে উল্লেখ করেন, বিরোধীদলীয় নেতা নির্দিষ্ট কোনো ধারায় সংশোধনী প্রস্তাব দেননি, বরং সাধারণ বক্তব্য রেখেছেন। এরপর মন্ত্রী বিলটি উত্থাপন করলে সংসদীয় প্রক্রিয়া শেষে তা পাস হয়।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশে এসব সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সংসদের বিশেষ কমিটি ওই অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেওয়ার সুপারিশ করে। যদিও কমিটিতে জামায়াতের সদস্যরা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক দলকে সরাসরি সহযোগী শক্তি হিসেবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করা যুক্তিযুক্ত নয়।
নতুন আইনে শুধু মুক্তিযোদ্ধা নয়, ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ এবং তাদের পরিবারকেও স্বীকৃতির আওতায় আনা হয়েছে। বিদেশে থেকে জনমত গঠনকারী প্রবাসী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী, চিকিৎসক, সাংবাদিক এবং স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্যদেরও এই সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া বিলে ২০২৫ সালের সংশোধন অধ্যাদেশ রহিত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, তবে সেই অধ্যাদেশের অধীনে নেওয়া কার্যক্রমগুলো নতুন আইনের অধীনে বৈধ বলে গণ্য হবে।