জানা নিউজ

দুই ঘণ্টার সংঘর্ষের পর শান্ত মিরপুর, স্বাভাবিক যান চলাচল-মেট্রোরেল

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর মিরপুরে পুলিশের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি চালু হয়েছে বন্ধ রাখা মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশন। সংঘর্ষ ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় অন্তত পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় সাত থেকে আটজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল থেকে মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় জড়ো হতে থাকেন বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। সকাল ১০টার দিকে তাঁরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দিতে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। আন্দোলনকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে।

সকাল সোয়া ১০টার দিকে সংঘর্ষের প্রথম দফা শুরু হয়। প্রায় আধা ঘণ্টা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার পর আন্দোলনকারীরা মূল সড়ক ছেড়ে আশপাশের গলিতে সরে যান। তবে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁরা আবারও সংগঠিত হয়ে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় পুলিশও পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার পর দুপুর ১২টার দিকে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন।

এদিকে সংঘর্ষের সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য বিচ্ছিন্ন অবস্থায় হামলার শিকার হন। পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন জানান, মিরপুর-১১ এলাকা থেকে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেওয়ার পর তাঁদের একটি অংশ কালশীর দিকে চলে যায়। এ সময় পল্লবী থানা থেকে কয়েকজন পুলিশ সদস্য মিরপুর-১১-এর দিকে যাওয়ার পথে তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়।

পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় অন্তত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান ওসি। তাঁর ভাষ্য, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা পোশাকশ্রমিক নন। প্রাথমিকভাবে তাঁদের আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের সদস্য হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

সংঘর্ষের ঘটনায় সাত থেকে আটজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে কয়েকজন ব্যক্তিকে লাঠি দিয়ে এক পুলিশ সদস্যকে মারধর করতে দেখা যায়। এ সময় অন্য কয়েকজন হামলাকারীদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (পিওএম-দক্ষিণ) মোহাম্মদ তৌহিদুল আরিফ বলেন, পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে দুষ্কৃতকারীরা অনুপ্রবেশ করেছে। শ্রমিক নেতারা আগের দিন আন্দোলন থেকে সরে আসার কথা জানিয়েছিলেন। এরপরও যারা বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন, তারা শ্রমিক নন, বরং দুষ্কৃতকারী। আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংঘর্ষের কারণে মিরপুর-১১ থেকে মিরপুর-১০ ও পল্লবীগামী সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। দুপুর ১২টার পর পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে যানবাহন চলাচল বাড়ে এবং দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

নিরাপত্তার কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশন। সংঘর্ষের সময় স্টেশন দুটির প্রবেশপথ বন্ধ থাকায় যাত্রীরা ওঠানামা করতে পারেননি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আবারও স্টেশন দুটিতে ট্রেনের যাত্রাবিরতি ও যাত্রী ওঠানামা শুরু হয়। তবে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের বাকি অংশে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক ছিল।

এদিকে শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে মিরপুরের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে একটি জলকামান ও দুটি সাঁজোয়া যান প্রস্তুত রাখা হয়। পুলিশের পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) সদস্যদেরও সতর্ক অবস্থানে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।

সংঘর্ষের পর মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় বিএনপির অঙ্গসংগঠন যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যায়। তাঁদের কয়েকজনকে লাঠি হাতে সড়কে অবস্থান নিতে দেখা যায়। দুপুরে যুবদলের নেতাকর্মীরা মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মিছিল করেন। পরে বেলা ১টা ১৬ মিনিটের দিকে মিরপুর-১১ নম্বর এলাকাতেও তাঁদের মিছিল করতে দেখা যায়। এ সময় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন তাঁরা।

পল্লবী থানার ওসি জালাল উদ্দিন বলেন, বেলা ১২টার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। সড়কে যানবাহন চলাচলও স্বাভাবিক হয়েছে। তবে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নতুন করে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পোশাকশ্রমিক জানান, তাঁদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। তাঁর অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে। দুপুরের খাবারের বিরতির পর শ্রমিকেরা আবারও আন্দোলনে নামতে পারেন বলেও জানান তিনি।

এর আগে কয়েক দিন ধরে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন করে আসছেন পোশাকশ্রমিকেরা। গত রোববার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়। ওই দিন পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। সোমবারও শ্রমিকেরা সড়কে নামার চেষ্টা করেন। তবে পুলিশের বাধায় তাঁরা সড়কে অবস্থান নিতে পারেননি।

মঙ্গলবারের সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি শান্ত হলেও নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুরো এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক অবস্থান অব্যাহত রয়েছে।