জানা নিউজ

দাম বাড়ানোর পরও প্রতি লিটার জ্বালানিতে ৭০ টাকা ভর্তুকি: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম, জাহাজ ভাড়া ও বীমা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই দেশে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, দাম বাড়ানোর পরও সরকারকে প্রতি লিটার জ্বালানি তেলে গড়ে ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের যে কষ্ট হবে, সে জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে এক ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।

অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট প্রতিদিন নতুন মাত্রা পাচ্ছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। একই সঙ্গে বেড়েছে জাহাজ ভাড়া ও বীমা প্রিমিয়াম। এ অবস্থায় দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা ছাড়া সরকারের সামনে কার্যত আর কোনো বিকল্প ছিল না।

তিনি বলেন, উপায়হীন না হলে সরকার এমন একটি অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে চাইত না। জনগণের জীবনমানের কষ্ট লাঘবের অভিপ্রায়েই তিনি রাজনীতিতে এসেছেন উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে মানুষের যে কষ্ট হবে, তা তিনি উপলব্ধি করেন। এ জন্য জনগণের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।

বিপিসির বড় লোকসান
প্রতিমন্ত্রী জানান, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা সম্ভব না হওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এ সময়ে প্রতি মাসে গড়ে লোকসানের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা।

দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টনই ডিজেল।

প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের গড় মূল্য প্রতি লিটার প্রায় ২০৫ টাকা। অথচ মূল্য সমন্বয়ের আগে দেশে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১১৫ টাকা দরে। ফলে প্রতি লিটারে প্রায় ৯০ টাকা লোকসান হচ্ছিল।

দাম সমন্বয়ের পরও বিপিসিকে গড়ে প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলে জানান অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

তিনি বলেন, মূল্য সমন্বয় না করলে শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হতো। সব ধরনের জ্বালানি তেল মিলিয়ে এই ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা হতে পারত।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কথাও তুলে ধরলেন প্রতিমন্ত্রী
জ্বালানি তেলে বড় অঙ্কের ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতো বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

তার ভাষ্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানির মূল্য সমন্বয় না করা হলে দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারের বিভিন্ন সহায়তা ও ভাতা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণসহ বিভিন্ন সরকারি সেবাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

এ কারণেই দেশের গরিব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য চলমান সেবাগুলো সচল রাখতে সরকার কঠিন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান তিনি। সরকারের এই পরিস্থিতি ও সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষ ইতিবাচকভাবে উপলব্ধি করবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।

প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে দাম কম ছিল
জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিবেশী ও এশিয়ার কয়েকটি দেশের ডিজেলের দামের তুলনাও তুলে ধরেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

তিনি জানান, কলকাতায় ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা ২২ পয়সা এবং ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা।

এ ছাড়া ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা দরে ডিজেল বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, মূল্য সমন্বয়ের আগে এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম ছিল।

কম দামের কারণে দেশের জ্বালানি তেল প্রতিবেশী দেশে পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছিল বলে জানান তিনি। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সের অর্থে কেনা জ্বালানি যাতে পাচার না হয়, সেটিও মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

নতুন দামে ডিজেল ১৩৫, পেট্রোল ১৬০ টাকা
জ্বালানি তেলের নতুন দাম সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে। নতুন দামে ডিজেলের প্রতি লিটার ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, মূল্য সমন্বয়ের প্রভাব যাতে সাধারণ মানুষের ওপর যতটা সম্ভব কম পড়ে, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। একই সঙ্গে বাজারে নজরদারি জোরদার করা হবে, যাতে জ্বালানির দাম বাড়ার সুযোগ নিয়ে কোনো অসাধু চক্র অতিরিক্ত মুনাফা করতে না পারে।

পরিবহন খরচ নিয়েও নজরদারির কথা জানান তিনি। বাসের ভাড়া যেন অযৌক্তিকভাবে না বাড়ে, সে বিষয়টি মনিটরিং করা হবে। যোগাযোগ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে ভাড়া সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে পরিবহন খরচ বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যাতে অযৌক্তিকভাবে না বাড়ে, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারি থাকবে।

সংকট কাটলে আবার দাম কমানোর আশা
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটকে আগের বিভিন্ন সংকটের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ কিংবা কোভিড-১৯ মহামারির সময়ের পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি তুলনীয় নয়।

তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত কঠিন ছিল। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা এবং বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণের পরই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দ্রুত কেটে যাবে বলে আশাবাদী প্রতিমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং দাম কমলে দেশে জ্বালানি তেলের দাম আবার সমন্বয় করা হবে বলে জানান তিনি।

পরিস্থিতি অনুকূলে এলে আগের দামে, এমনকি তার চেয়েও কম দামে জ্বালানি বিক্রির সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।