ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দিলীপ কুমার আগারওয়ালাকে অর্থপাচারের মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। স্বর্ণ ও হীরা কেনার উৎসের বৈধ নথি না থাকা এবং চোরাচালানের মাধ্যমে এসব পণ্য কেনাবেচার অভিযোগে করা মামলায় তাঁকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। শুনানি শেষে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে সোমবার (১৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে দিলীপ কুমার আগারওয়ালাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) গুলশান বিভাগ। সিআইডির অনুরোধে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর পর মঙ্গলবার তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়।
সিআইডির অভিযোগ, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের কার্যক্রম অনুসন্ধান করতে গিয়ে স্থানীয় বাজার থেকে কেনা স্বর্ণ ও হীরার বৈধ উৎসের নথি পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ ১৪ হাজার ১৪ টাকার স্বর্ণ ও হীরা কেনাবেচা, বিনিময় বা রূপান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব পণ্য অবৈধভাবে সংগ্রহ করা হয়েছিল কি না এবং এর মাধ্যমে অর্থপাচার হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির উপপরিদর্শক মো. আশরাফুল হাসান দিলীপ আগারওয়ালাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে অংশ নেন ঢাকা মহানগর আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন। তিনি আদালতকে বলেন, দিলীপ আগারওয়ালার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে স্বর্ণ ও হীরা সংগ্রহের তথ্য রয়েছে।
সিআইডির আবেদনে বলা হয়, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের কার্যক্রম নিয়ে অনুসন্ধানে বিভিন্ন সময়ে আমদানি, স্থানীয় বাজার থেকে কেনা এবং বিনিময়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করা স্বর্ণ ও হীরার উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে। এসব পণ্যের বৈধ উৎসের নথি অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাদের কাছে উপস্থাপন করা হয়নি বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধানে ব্যাংক হিসাব, নথিপত্র ও জিজ্ঞাসাবাদ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে বৈধভাবে বিদেশ থেকে ৩৮ কোটি ৪৭ লাখ ৪৮ হাজার ১১ টাকা ৫২ পয়সার স্বর্ণবার, স্বর্ণালংকার ও হীরা আমদানি করেছে। অন্যদিকে, একই সময়ে স্থানীয় বাজার থেকে ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ ১৪ হাজার ১৪ টাকার স্বর্ণ ও হীরা কেনাবেচা, বিনিময় বা রূপান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করা এসব স্বর্ণ ও হীরার উৎস কিংবা বিক্রেতাদের বিষয়ে বৈধ নথি সিআইডির কাছে উপস্থাপন করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড ও ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেডকে ব্যবহার করে চোরাচালানের মাধ্যমে স্বর্ণ ও হীরা কেনাবেচা করে ওই অর্থ অর্জন করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে সংস্থাটি।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গুলশান অ্যাভিনিউয়ে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের শোরুম ও কার্যালয়ে এসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান শেখ বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলা করেন। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর মামলাটি করা হয়। এটি বর্তমানে তদন্তাধীন।
আদালতে দিলীপ আগারওয়ালার পক্ষে রিমান্ডের বিরোধিতা করেন আইনজীবী আনোয়ার কবির। তিনি বলেন, তাঁদের আমদানি করা স্বর্ণ ও হীরা বৈধভাবে দেশে আনা হয়েছে। ২০০৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আমদানির সব কাস্টমস সনদ তাঁদের কাছে রয়েছে।
শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে চোরাকারবারি বলা যায় না উল্লেখ করে তিনি রিমান্ড আবেদন বাতিলের দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য, তদন্তের স্বার্থে কোনো তথ্য জানার প্রয়োজন হলে দিলীপ আগারওয়ালা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করবেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী তাঁর বয়স এবং সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি তুলে ধরে মানবিক দিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত দেওয়ার আবেদনও জানান। পাশাপাশি রিমান্ড বাতিলের সঙ্গে জামিনের আবেদন করা হয়।
উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত তিন দিনের আবেদনের বিপরীতে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মঙ্গলবার দুপুর ২টা ৫৫ মিনিটে আদালতের হাজতখানা থেকে দিলীপ আগারওয়ালাকে বের করে পুলিশি পাহারায় এজলাসে নেওয়া হয়। লিফট নষ্ট থাকায় তাঁকে হেঁটে ষষ্ঠ তলায় উঠতে হয়। এজলাসে পৌঁছে কিছু সময় আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায় তাঁকে।
বিকেল ৩টা ১৩ মিনিটে বিচারক এজলাসে আসেন। এরপর সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা রিমান্ড আবেদনের পক্ষে বক্তব্য দেন। শুনানি শেষে আদালত এক দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।
দিলীপ কুমার আগারওয়ালা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। সে সময় স্বর্ণ ও হীরা চোরাচালান, প্রতারণা, জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন হত্যা মামলায়ও তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে এসব মামলায় জামিন পাওয়ার পর ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
এবার স্বর্ণ ও হীরার উৎস এবং অর্থপাচারের অভিযোগে করা মামলায় তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। মামলাটি এখনো তদন্তাধীন। সিআইডির অভিযোগ এবং আসামিপক্ষের বক্তব্যের বিষয়ে আদালতে শুনানি হয়েছে; অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।