জানা নিউজ

কলম্বিয়ায় ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ২৪১, ধ্বংসস্তূপে জীবিতদের খুঁজছেন উদ্ধারকারীরা

শত বছরের মধ্যে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২৪১ জন হওয়ার পর গত মঙ্গলবার পশ্চিম কলম্বিয়া জুড়ে ধসে পড়া আবাসিক ভবন ও অফিস ভবনের ধ্বংসস্তূপে জীবিতদের খুঁজেছেন উদ্ধারকর্মী, সেনাসদস্য ও স্বেচ্ছাসেবীরা। এ ঘটনায় বহু মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। পেরেরা ও কালিতে পরাঘাতের কম্পনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনগুলোর পাশে পরিবারের সদস্যরা পার্কে রাত কাটিয়েছেন। কলম্বিয়ার পেরেরা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা ক্রেন, প্রশিক্ষিত কুকুর ও ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ধসে পড়া ভবনে তল্লাশি চালান। স্বেচ্ছাসেবীরা মানবশৃঙ্খল তৈরি করে হাতে হাতে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে জীবিত কেউ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন কি না, তা খুঁজে দেখেন। পৌর কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পে ১ হাজার ৬৭০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ভূমিকম্পে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কিছু অংশ চাপের মুখে পড়ে। কয়েক বছরের মধ্যে কলম্বিয়ার সবচেয়ে বড় দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রমগুলোর একটিতে পরিণত হয় উদ্ধার অভিযান। বিয়াত্রিজ আরকোস বলেন, ‘বাড়িটি আমাদের ওপর ধসে পড়ে। আমি বের হতে পারিনি।’ স্বামী ও মায়ের সঙ্গে ধসে পড়া একটি কনডোমিনিয়ামের নিচে আটকা পড়েছিলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমাদের বের করতে প্রায় এক ঘণ্টা লেগেছিল।’আরকোস জানান, কংক্রিটের একটি খণ্ড তার পিঠের ওপর পড়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। তার স্বামী ও মাও আহত হয়েছেন। কালিতে বাসিন্দারা কোদাল, শাবল ও খালি হাতে দমকলকর্মীদের সঙ্গে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে যোগ দেন। উদ্ধারকারীরা কয়েক মিনিট পরপর কাজ থামিয়ে ধ্বংসস্তূপের দিকে ডাক দেন। এরপর কোনো সাড়া পাওয়া যায় কি না, তা শোনার চেষ্টা করেন। স্বেচ্ছাসেবী আন্দ্রেস ফেলিপে মেহিয়া বলেন, ‘একজন উদ্ধারকর্মী ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা কাউকে শিস দিতে বলেন। তখন কেউ একজন শিস দিয়ে সাড়া দেন।’ তিনি বলেন, পরে উদ্ধারকারীরা ধসে পড়া একটি ভবন থেকে এক ব্যক্তি ও একটি শিশুকে উদ্ধার করেন। তবে ওই ব্যক্তির স্ত্রী তখনও আটকা ছিলেন। পেরেরায় সেনাসদস্য ও প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে বেঁকে যাওয়া কংক্রিট ও বেরিয়ে থাকা ইস্পাতের মধ্যে তল্লাশি চালানো হয়। একটি স্থানে উদ্ধারকারী দলের নেতা হঠাৎ মুঠি উঁচিয়ে ধরেন। শ্রমিকদের কাজ থামিয়ে জীবনের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় কি না, তা শুনতে বলা হয়। স্বেচ্ছাসেবীরা মানবশৃঙ্খল তৈরি করেন। হাতে হাতে ইট ও কংক্রিটের টুকরা সরিয়ে ধসে পড়া ভবনের ভেতরে যাওয়ার পথ তৈরি করেন।
‘এত পরিশ্রম’
অনেক পরিবারের কাছে মরিয়া এই উদ্ধার অভিযান অপেক্ষার প্রহরে পরিণত হয়। পেরেরায় ধসে পড়া একটি ভবনের পাশে দাঁড়িয়ে হোর্হে গনসালেস বলেন, ‘আমার খালা সেখানে থাকতেন। তিনি ধ্বংসস্তূপের নিচে আছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমি গতকাল এখানে এসেছি। এরপর আর যাইনি। তার মরদেহ খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত এখান থেকে যাওয়ার ইচ্ছা নেই।’ কেউ নিখোঁজ স্বজনের খবরের অপেক্ষায় ছিলেন। আবার কেউ ঘরবাড়ি, সম্পদ ও জীবিকা হারানোর শোক সামলানোর চেষ্টা করছিলেন। নিজের বাড়ি ধসে পড়ার পর প্রাণে বেঁচে যাওয়া স্টেলা গালভিস চোখের পানি সামলে বলেন, ‘আমরা সবকিছু হারিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘অলৌকিকভাবে আমরা বেঁচে গেছি। আমি আমার ছোট ছেলেকে বের করে আনতে পেরেছি। আমার সঙ্গীও বের হতে পেরেছেন।’ আকাশ থেকে কালির বিভিন্ন এলাকা পুরোপুরি বিধ্বস্ত মনে হচ্ছিল। বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের পুরো ব্লকের জায়গা দখল করে ছিল ধূসর ধ্বংসস্তূপের স্তূপ। কাছেই ভেঙে পড়া দেয়াল ও কংক্রিটের স্ল্যাবের নিচে গাড়িগুলো চাপা পড়ে ছিল। ধ্বংসস্তূপের একটি স্তূপে এক তরুণ দম্পতি ভাঙা ইট ও কংক্রিটের টুকরার ওপর দিয়ে উঠে নিজেদের জিনিসপত্র খুঁজছিলেন। তারা একটি শিশুর উজ্জ্বল লাল রঙের শয্যাপাশের টেবিলের ভেতর থেকে একটি বাক্স উদ্ধার করেন। অনেক জীবিত মানুষ রাত কাটিয়েছেন খোলা আকাশের নিচে। কেউ বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়, আবার কেউ পরাঘাতের ভয়ে বাইরে ছিলেন। পেরেরার একটি পার্ক তাঁবু ও গদি দিয়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে স্ত্রী ও সাত মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে আশ্রয় নেওয়া ২৩ বছর বয়সী জন তাবাসকো বলেন, ‘আমরা সবকিছু হারিয়েছি। কিন্তু বেঁচে আছি।’ তিনি বলেন, ‘এর আগে কখনো আমাদের এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি, অন্য কারও সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়নি। জীবন কীভাবে বদলে যেতে পারে, তা অবিশ্বাস্য।’ কয়েক দশক ধরে গড়ে তোলা বাড়ি হারানোর বিষয়টি মেনে নিতেও অনেকে হিমশিম খাচ্ছিলেন। ৭৯ বছর বয়সী হাইমে আলসাতে বলেন, ‘এত পরিশ্রম করে আপনি একটি ছোট বাড়ি কেনেন। ৪০, ৫০ বছর ধরে সংগ্রাম করে সেই বাড়িটি অর্জন করেন। শেষ পর্যন্ত যখন বাড়িটি পান, তখন মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়।’ কালিতে ভূমিকম্পের সময় হসপিটাল ইউনিভার্সিতারিও দেল ভায়ের একটি অংশ ধসে পড়ে। চিকিৎসকদের রোগীদের পার্কিং এলাকায় সরিয়ে নিতে হয়। কয়েকজনকে খোলা আকাশের নিচে চিকিৎসা দিতে হয়। শিশু, অভ্যন্তরীণ চিকিৎসা ও নবজাতক সেবার তিনটি তলা শেষ পর্যন্ত ধসে পড়ে। এতে হাসপাতালটির রোগী ধারণক্ষমতা ৫৯০ থেকে কমে ৩৫০-এ নেমে আসে। তবে ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও বহু কলম্বিয়ান সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন। হাজারো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পানি, খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে যান। রক্তদানের কেন্দ্রগুলোর সামনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। রক্তদাতা ফেরনি কাবরেরা বলেন, ‘নিজের সমপ্রদায়, শহর ও দেশকে সাহায্য করার ইচ্ছা থেকেই এটি করা হচ্ছে।’ প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা গত মঙ্গলবার পেরেইরা সফরের সময় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য বাড়িভাড়া ভর্তুকির প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র জরুরি সহায়তা হিসেবে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও সমর্থনের বার্তা ও সহায়তার প্রস্তাব এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোতে পরাঘাতের কম্পন অব্যাহত থাকলেও উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন। আরও কোনো কণ্ঠস্বর, টোকা বা শিসের শব্দ শোনা যায় কি না, সেই আশায় তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।