আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (কপ-৩১)। সম্মেলনের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে (হাই-লেভেল সেগমেন্ট) বাংলাদেশের পক্ষে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।
মন্ত্রী বলেন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, লবণাক্ততা, খরা ও তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশের মানুষের জীবন, জীবিকা ও উন্নয়ন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষের স্বার্থ, জাতীয় অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করবে কপ-৩১-এ প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ।
অনুদানভিত্তিক অর্থায়নে জোর
সম্মেলনে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার থাকবে জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং সহজে অর্থ পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা। উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুত অর্থায়নের পাশাপাশি নতুন অর্থায়ন লক্ষ্যের আলোকে পর্যাপ্ত, পূর্বানুমানযোগ্য ও প্রধানত অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন চাইবে বাংলাদেশ।
বিশেষ করে অভিযোজন এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি (লস অ্যান্ড ড্যামেজ) মোকাবিলায় অনুদান বাড়ানোর দাবি জানানো হবে। পাশাপাশি জলবায়ু তহবিলের আবেদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়টিও তুলে ধরবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল।
মন্ত্রী জানান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার মতামত এবং জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানপত্র তৈরি করা হয়েছে। সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জোট, জি-৭৭ ও চীন এবং সমমনা জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে জাতীয় স্বার্থে কাজ করবে বাংলাদেশ।
জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে। উপকূলীয় অঞ্চল, হাওর, চর ও খরাপ্রবণ এলাকার মানুষের পানি, খাদ্য, স্বাস্থ্য ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচনায় থাকবে। পাশাপাশি আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে অভিযোজন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও জনগোষ্ঠীর জন্য লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড থেকে দ্রুত ও সহজে অনুদান পাওয়ার ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানাবে বাংলাদেশ। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বাস্তুচ্যুতি ও জীবিকা হারানোর মতো অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় নতুন ও অতিরিক্ত সহায়তাও চাওয়া হবে।
জ্বালানি ও শিল্পে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি চাই
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার লক্ষ্য অর্জনে দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর ওপর গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোকে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হবে। একই সঙ্গে বড় নির্গমনকারী দেশগুলোকে তাদের দায়িত্ব ও সক্ষমতা অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলা হবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও চাইবে বাংলাদেশ। কৃষি, শিল্প, পরিবহন ও জ্বালানি খাতের পরিবেশবান্ধব রূপান্তরে সহায়তার বিষয়টি তুলে ধরা হবে।
এ ক্ষেত্রে ন্যায্য রূপান্তর প্রক্রিয়ায় ব্যয় ও সুফলের সুষম বণ্টন, শ্রমিকের অধিকার, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। নারী ও তরুণদের জন্য শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিও আলোচনায় থাকবে।
প্যারিস চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় কার্বন বাজারকে অর্থায়ন ও প্রযুক্তি পাওয়ার পরিপূরক উৎস হিসেবে ব্যবহারের বিষয়েও আলোচনা করবে বাংলাদেশ। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা, পরিচ্ছন্ন শিল্প ও পরিবহন এবং জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার চাওয়া হবে।
বন, ম্যানগ্রোভ, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের জন্য সহায়তা বাড়ানোর বিষয়টিও বাংলাদেশের অগ্রাধিকারে থাকবে। জলবায়ু কার্যক্রমে নারী, শিশু, তরুণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নারী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে পরিচালিত উদ্যোগে অর্থায়ন সহজ করার পক্ষে অবস্থান নেবে বাংলাদেশ।
জলবায়ু পদক্ষেপের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইবে বাংলাদেশ। একতরফা বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট জলবায়ু ব্যবস্থায় বৈষম্য এড়ানো এবং শিল্প খাতকে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি গ্রহণে সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সম্মেলনে বাংলাদেশের প্যাভিলিয়ন
কপ-৩১-এর সম্মেলনস্থলে ১০০ বর্গমিটারের একটি প্যাভিলিয়ন স্থাপন করবে বাংলাদেশ সরকার। সেখানে দেশের জলবায়ু ঝুঁকি, অভিযোজনের অভিজ্ঞতা, এনডিসি ৩.০, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা, জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি, অর্থায়ন, কার্বন বাজার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে।
প্যাভিলিয়নটি অভিজ্ঞতা বিনিময়, নীতি সংলাপ এবং উন্নয়ন সহযোগী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা তৈরির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, কপ-৩১ থেকে বাংলাদেশের প্রত্যাশা হলো জলবায়ু অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন সহায়তার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি অর্জন। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করে মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষায় সম্মেলনের সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে সরকার।
তিনি আরও বলেন, ন্যায্যতা এবং অভিন্ন কিন্তু পৃথকীকৃত দায়িত্ব ও নিজ নিজ সক্ষমতার নীতি বাংলাদেশের আলোচনার ভিত্তি হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে জাতীয় পরিকল্পনা ও স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করে বাস্তবায়নে কাজ করবে সরকার।