জানা নিউজ

ইরানে রাতভর ভয়াবহ হামলা যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আবারো তীব্র আকার ধারণ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন হামলার হুঁশিয়ারির পর ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে বহু স্থানে রাতভর বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগের দিনই দেশটির ওপর আরেকটি বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছিল। খবর আল-জাজিরার। গত জুনের মাঝামাঝিতে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের পর, গত বুধবার রাতের এই সংঘাতই সবচেয়ে ভয়াবহ। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের ইরানশাহর বিমানবন্দরে মার্কিন হামলায় এক দমকলকর্মী নিহত হয়েছেন। ইরানশাহর বিমানবন্দর ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের বন্দর আব্বাস, কোনারক, চাবাহার ও বুশেহর এবং উত্তর-পূর্ব ইরানের আক কালা অঞ্চলেও হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। গত বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, “প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে তাদের বাহিনী ‘হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলের স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলার সক্ষমতা আরো গুঁড়িয়ে দিতে ইরানের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত হামলা শুরু করেছে।” সেন্টকম বলেছে, “একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে অবাধে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ এবং বেসামরিক ক্রুদের বিরুদ্ধে সামপ্রতিক অন্যায় আগ্রাসনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে জবাবদিহি করছে।” ইরানি কর্মকর্তারা ফার্স নিউজ এজেন্সিকে জানিয়েছেন, চাবাহারে একটি সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার ও একটি ডিপোতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। আক কালায় একটি রেলওয়ে সেতুতে হামলা হয়েছে। গত বুধবার রাতে মার্কিন হামলার ঘটনার কড়া জবাবের ইঙ্গিত দিয়ে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি এক্স-এ লিখেছেন, “ইরানিদের কাছ থেকে কঠিন চড়ের জন্য অপেক্ষা করুন।” এর আগে, গত মঙ্গলবার রাতেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছিল। তারা দাবি করেছে, ‘হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি হামলার জবাবে’ এই হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা দেশটির সেনাবাহিনীর একটি বিবৃতির বরাত দিয়ে জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বন্দর আব্বাস এবং বুশেহরের এলাকাগুলোতে মঙ্গলবারের হামলায় দেশটির বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনীর আটজন সদস্য নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে সমঝোতা স্বারক লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। গত জুনের স্বাক্ষরিত এই সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হয়েছিল, ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়েছিল এবং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা হয়েছিল। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং প্রণালির প্রশাসনের মতো আরো জটিল বিষয়গুলো ৬০ দিনের আলোচনা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণের জন্য বাকি রাখা হয়েছিল। আল-জাজিরার প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামপ্রতিক বিরোধের সূত্রপাত সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম ধারাটি নিয়ে। যেখানে বলা হয়েছে, “ইরান পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং এর বিপরীতে কোনো শুল্ক ছাড়াই, কেবল ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের জন্য তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে ব্যবস্থা করবে।” ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গত বুধবার বলেছেন, ইরান এই ধারাটির অর্থ এভাবে ব্যাখ্যা করেছে যে, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা নির্ধারণের একক দায়িত্ব’ তাদের। এই অবস্থানটিকেই প্রণালি পার হওয়া অননুমোদিত জাহাজগুলোতে হামলার ন্যায্যতা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পেন্টাগনের সাবেক ন্যাটো অপারেশন ডিরেক্টর ডেভিড ডেস রচেস আল-জাজিরাকে বলেন, “সমঝোতা স্মারকের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন ছিল ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে পারস্পরিক অবরোধ তুলে নেওয়া- যা তারা করেছে; ইরানের তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা মওকুফ করা- যা তারা করেছে; এবং ইরানের প্রয়োজন ছিল হরমুজ প্রণালিতে বেসামরিক জাহাজ চলাচলে বাধা না দেওয়া।” তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ইরান যখন এই জাহাজগুলোতে হামলা চালায়, তখন তেহরান সমঝোতা স্মারকের শর্তের বাইরে গিয়ে একটি নতুন নিয়ম তৈরি করার চেষ্টা করছিল। যার অর্থ দাঁড়ায় জাহাজগুলোকে ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, অন্যথায় ইরান সেগুলোতে হামলা চালাবে। ডেস রচেস বলেন, “এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এই হামলাগুলো সেই পদক্ষেপেরই একটি প্রতিশোধ।” গত বুধবার রাতের হামলার পর ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে বলেন, “হরমুজ প্রণালি কেবল ‘ইরানি ব্যবস্থায়’ উন্মুক্ত হবে, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিতে নয়।” গালিবাফ আরো লেখেন, “যুক্তরাষ্ট্র এখনো শিক্ষা নেয়নি যে গুন্ডামি এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এখন আর খেসারতহীন নয়। সহজ কথায় বলি: আপনি যদি আঘাত করেন, তবে পাল্টা আঘাত পাবেন।” এদিকে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘খুব শক্ত’ আঘাত করেছে। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, “আমি বলছি আমরা তাদের ২০ বনাম ১ অনুপাতে আঘাত করেছি। প্রতিবার তারা আমাদের আঘাত করলে, আমরা তাদের ২০ গুণ শক্তিতে আঘাত করব। যখন তারা আঘাত করবে, আমরা আরো অনেক শক্তভাবে পাল্টা আঘাত করব।” পরবর্তী দফার হামলা ছাড়াও ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আবারো নৌ-অবরোধ আরোপ করতে পারে, এমননি দেশটির বিদ্যুৎ ও পানি শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। তিনি এও বলেন যে, মার্কিন বাহিনী ইরানের ‘খার্গ দ্বীপ’ দখল করে নিতে পারে। অন্যদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের এই সামরিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন মার্কিন বিরোধী দলীয় ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বলেছেন, ইরানের সঙ্গে এই অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ কেবল মার্কিন করদাতাদের ডলারের অপচয় ঘটাবে এবং আরো বহু মানুষের জীবন কেড়ে নেবে। সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবকে দায়ী করে বলেছেন, তার ভুল নীতির কারণে ইতিমধ্যে আমেরিকানদের জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে।