মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়ে এখন উপসাগরীয় দেশগুলোর শিল্প স্থাপনাতেও আঘাত হানছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তারা সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের গুরুত্বপূর্ণ অ্যালুমিনিয়াম স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলা শুধু সামরিক উত্তেজনাই নয়, বৈশ্বিক শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও নতুন করে চাপও তৈরি করছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। গতকাল রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি-তে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করে, গত শনিবার যেসব স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে, সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংশ্লিষ্টতার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
বাহরাইনের অ্যালুমিনিয়াম বাহরাইন (আলবা) জানিয়েছে, তাদের কারখানায় হামলায় দুইজন কর্মী আহত হয়েছেন। আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়াম (ইজিএ) জানিয়েছে, আবুধাবিতে তাদের একটি স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে এবং ছয়জন আহত হয়েছেন। আইআরজিসি বলেছে, উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থেকে ইরানের শিল্প অবকাঠামোর ওপর চালানো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
দুবাই থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক জেইন বাসরাভি বলেন, ‘বিশ্বের মোট অ্যালুমিনিয়াম সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৯ শতাংশ এই অঞ্চল থেকে আসে। এ কারণে এই হামলা বৈশ্বিক সরবরাহকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে’। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বাহরাইনসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে নিয়মিত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। এখন এই সংঘাত পঞ্চম সপ্তাহে গড়িয়েছে। এদিকে ওমানের সালালাহ বন্দরে গত শনিবার ড্রোন হামলায় একজন শ্রমিক আহত হয়েছেন। পরে ডেনমার্কের কনটেইনার শিপিং কোম্পানি মার্স্ক জানায়, তারা সাময়িকভাবে ওই বন্দরে কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং বলেছে, ঘটনার উৎস ও উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখনও কোনও পক্ষ হামলার দায় স্বীকার করেনি।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গত কয়েক ঘণ্টায় ১০টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। অবশ্য কোথায় বা কোন অঞ্চরে এগুলো প্রতিহত করা হয়েছে, তা জানানো হয়নি। কুয়েতের ন্যাশনাল গার্ড জানিয়েছে, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দ্বিতীয়বার হামলার সতর্কতা সাইরেন বাজানোর পর তারা চারটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদক বাসরাভি বলেন, ‘ইরান যদি একইভাবে হামলার জবাবে হামলা চালিয়ে যায়, তাহলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ ইরানের ওপর হামলাও বাড়ছে এবং সংঘাত ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইরানে উত্তেজনা বাড়লে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলোতেও এর প্রভাব পড়া অবশ্যম্ভাবী।’ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, চলমান এই যুদ্ধে উভয় পক্ষই ‘টিট-ফর-ট্যাট’ কৌশল অনুসরণ করছে। অর্থাৎ, এক পক্ষ যে ধরনের স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে, অন্য পক্ষও একই ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত করছে। যেদিন ইরান বাহরাইন ও আমিরাতের অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় হামলা চালায়, সেদিনই ইসরায়েল ইরানে দুটি ইস্পাত কারখানায় আঘাত হানে। এদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, নতুন করে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা ইউএসএস ট্রিপোলি জাহাজে করে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। সব মিলিয়ে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।