জানা নিউজ

ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ঢাক-শঙ্খের ধ্বনি, মহাষষ্ঠীতে দেবীর বোধন

ঢাকের বাদ্য, শঙ্খের ধ্বনি আর ভক্তদের উলুধ্বনিতে মুখর রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির। ধূপের ধোঁয়া, প্রদীপের আলো আর ফুলে সাজানো বেলতলায় মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা।

 

মহাষষ্ঠীতে বোধন, আমন্ত্রণ ও পূজার মধ্য দিয়ে মর্ত্যে দেবী দুর্গাকে বরণ করে নেওয়া হয়েছে। দেবীর কাছে ভক্তদের প্রার্থনা– দূর হোক অশান্তি, প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি, সম্প্রীতি ও মানুষের মঙ্গল।

 

শুক্রবার সকাল ৯টায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের মেলাঙ্গনের বেলতলায় শুরু হয় ষষ্ঠীপূজার আনুষ্ঠানিকতা। ফুলে সাজানো বেলগাছের নিচে রাখা হয়েছিল ফলমূল, দইসহ নানা উপকরণ।

পাশে বেলপাতা, আমপাতা, দূর্বা ও পূজার অন্যান্য সামগ্রী। প্রদীপের আলো আর ধূপের ধোঁয়ায় তৈরি হয় ভক্তিময় পরিবেশ।
পুরোহিতদের মন্ত্রপাঠের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাজতে থাকে ঢাক, শঙ্খ ও ঘণ্টা। ভক্তদের উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। 

সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজা শেষ হয়। পরে পুরোহিত ভক্তদের মধ্যে শান্তির জল ছিটিয়ে দেন। অঞ্জলি নিয়ে দেবীর চরণে প্রণাম করেন উপস্থিত পুণ্যার্থীরা। পুরোহিতের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় সবার মঙ্গল ও অমঙ্গল দূর হওয়ার প্রার্থনা।

দেখা যায়, দেবী দর্শন ও পূজা দিতে মন্দিরে আসা ভক্তদের অনেকের প্রার্থনায় ছিল দেশের শান্তি ও মানুষের কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা। বর্তমান সময়ের অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা দূর হয়ে দেশে শান্তি ফিরে আসুক– এমন প্রত্যাশার কথা জানান পূজা দিতে আসা তাপসী সাহা।

তিনি চান, রোগ-শোক, দুঃখ, হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হয়ে সব ধর্মের মানুষ পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকুক। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা যেন মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি না করে, বরং সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার বন্ধন আরও দৃঢ় হোক।

ষষ্ঠীর পূজায় ভক্তদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সকালের আনুষ্ঠানিকতার পর মন্দিরে ভিড় কিছুটা কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেবী দর্শন ও শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসেন অনেকে। সন্তানদের দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য, মেধা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ কামনায় মায়েদের বিশেষ প্রার্থনা করতে দেখা যায়। পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়েও পূজায় অংশ নেন অনেকে।

ঘোড়ায় আগমন, নৌকায় বিদায়
সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্রীয় গণনা অনুযায়ী, এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘোটকে বা ঘোড়ায়, আর গমন নৌকায়। প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসে, কৈলাস থেকে কন্যারূপে দেবী দুর্গা মর্ত্যে তার বাপের বাড়িতে আসেন। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবেই দুর্গাপূজার আয়োজন।

মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হলেও সামনে রয়েছে পূজার আরও কয়েক দিনের আনুষ্ঠানিকতা। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, পরবর্তী দিনে প্রতিমায় প্রাণপ্রতিষ্ঠাসহ পূজার অন্যান্য আচার সম্পন্ন হবে। আগামী ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব শেষ হওয়ার কথা।

সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১ মণ্ডপে পূজা
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এবার সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরে পূজার আয়োজন করা হয়েছে ২৫৮টি মণ্ডপে।

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে মহাষষ্ঠীর আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই উৎসব শুধু ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয়, ভক্তদের কাছে এটি আনন্দ, মিলন ও শুভকামনার উপলক্ষ্য। ঢাকের তালে, শঙ্খের ধ্বনিতে আর প্রার্থনার আবহে তাই মন্দির প্রাঙ্গণে উচ্চারিত হচ্ছে একটিই প্রত্যাশা– অশুভের বিনাশ হোক, মানুষের জীবনে আসুক শান্তি ও কল্যাণ।