জানা নিউজ

বিকেলের ভাবনা

ডা. এম আর মামুন

সূর্যটা হেলে পড়েছে আকাশের পশ্চিম দেয়ালে। বিকেলের আলোয় পৃথিবীকে কেমন যেন অন্যরকম লাগে। দুপুরের প্রখরতা নেই, অথচ অন্ধকারও নামেনি। আলো ও অন্ধকারের এই সন্ধিক্ষণে প্রকৃতি যেন সারাদিনের অহংকার, উত্তাপ ও ব্যস্ততা ঝেড়ে ধীরে ধীরে নিজের কাছে ফিরে আসে।
জীবনও একসময় এমন এক বিকেলে এসে দাঁড়ায়। সামনে তখনও পথ থাকে, আলো থাকে; কিন্তু পেছনে তাকালে হঠাৎ টের পাওয়া যায়—জীবন সামনে যতটা পড়ে আছে, তার চেয়ে পেছনেই পড়ে আছে অনেক বেশি। আয়নায় নিজের মুখের চেয়ে তখন স্মৃতির মুখগুলোই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মনে হয়, এই তো সেদিন—অথচ সেই ‘সেদিন’-এর ভেতর দিয়ে কত জন্ম, কত মৃত্যু, কত ভালোবাসা, কত বিচ্ছেদ, কত না-বলা কথা নিঃশব্দে পেরিয়ে গেছে।
জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্যগুলোর একটি হলো—সবকিছু ফিরে আসে না।
মানুষ ফিরে আসে না। হারানো সময় ফিরে আসে না। কিছু সম্পর্ক ভেঙে গেলে জোড়া লাগে, কিন্তু আগের স্বরূপে আর ফিরে আসে না।
আবার কিছু বিদায় দরজা বন্ধ করে না; তারা মানুষের ভেতরেই একটি দীর্ঘ করিডর তৈরি করে, যার শেষ প্রান্তে সারাজীবন পায়ের শব্দ শোনা যায়।
তবু জীবন শুধু হারানোর নাম নয়। হারাতে হারাতেই মানুষ বুঝতে শেখে—কোন জিনিসগুলো আসলে হারানো উচিত ছিল না। কোন জিনিসগুলোর হারানোতেই সুখ ছিল।
তারুণ্যে ভালোবাসা মানে কাছে পাওয়া। পরিণত বয়সে ভালোবাসা মানে—একজন মানুষের অসম্পূর্ণতাকে জেনেও তার পাশে থাকার ইচ্ছা।
বয়সের একটা সময়ে এসে বোঝা যায়- সংসার দীর্ঘ কথোপকথনে টেকে না; টেকে অসংখ্য নীরব ক্ষমায়। ভালোবাসা বড় প্রতিশ্রুতিতে টেকে না; টেকে প্রতিদিনের সামান্য যত্নে। কখনো এক কাপ চা, কখনো অসুখের রাতে জেগে থাকা, কখনো অভিমানের পরও দরজাটা খোলা রাখা—এসব তুচ্ছ মুহূর্তই একদিন একটি দীর্ঘ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অধ্যায় হয়ে ওঠে।
জীবন অহংকারও ভাঙে বড় নিপুণতায়।
যে অপমান একদিন অসহনীয় মনে হয়েছিল, পরে তার স্মৃতিও ম্লান হয়ে যায়। যে মানুষটিকে ক্ষমা করতে পারেনি, একদিন তার দুর্বলতাগুলো বুঝতে পারে। তখন উপলব্ধি হয়—মানুষের সবচেয়ে বড় পরাজয় অন্যকে হারানো নয়; নিজের ভেতরের কঠোরতাকে জয় করতে না পারা।
সময় মানুষের মুখের বয়স বাড়ায়, কিন্তু তার চেয়েও বড় কাজ করে—বিচারের চোখ বদলে দেয়।
একসময় মানুষ মানুষকে বিচার করে তার কাজ দিয়ে। পরে বুঝতে শেখে, প্রত্যেক মানুষের দৃশ্যমান আচরণের পেছনে কিছু অদৃশ্য ক্ষত থাকে, কিছু অপ্রকাশিত ইতিহাস থাকে, কিছু যুদ্ধ থাকে যার খবর কেউ জানে না।
তাই বয়সের সঙ্গে রাগ কমে, মায়া বাড়ে। অভিযোগ কমে, কৃতজ্ঞতা বাড়ে। চাওয়া কমে, বোঝাপড়া বাড়ে।
এই পরিণতিই হয়তো জীবনের প্রকৃত শিক্ষা।
জীবন কোনো অর্জনের তালিকা নয়। জীবন হলো—কতটা ভালোবেসেছি, কতটা ক্ষমা করেছি, কতটা কষ্ট দিয়েও ফিরে এসেছি, আর কতটা অন্ধকারের মধ্যেও অন্যের জন্য আলো হয়ে থাকতে পেরেছি।
শেষ বয়সের সবচেয়ে ভারী বোঝা ব্যর্থতা নয়।
না-বলা কথা।
অপ্রকাশিত ভালোবাসা।
অমীমাংসিত অভিমান।
আর সেই কয়েকটি ‘যদি’, যেগুলো মানুষের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত হেঁটে যায়।
যদি আরেকটু সময় দিতাম।
যদি কথাটা না বলতাম।
যদি শেষবার ফিরে তাকাতাম।
যদি তাকে একটু বেশি ভালোবাসতাম।
জীবন কখনো কখনো এই ‘যদি’-গুলোর মধ্যেই ধীরে ধীরে সন্ধ্যায় পরিণত হয়।
জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সময় নয়; সময়ের মধ্যে সত্যিকারের উপস্থিতি।
যার পাশে আছি, তার পাশে থাকা। যাকে ভালোবাসি, তাকে তা জানানো। যার কাছে ঋণী, তাকে কৃতজ্ঞতা জানানো। আর যাকে ক্ষমা করা দরকার, তাকে নয়—নিজেকেই আগে মুক্ত করা।
সূর্যটা আরও নিচে নেমেছে।
তার আলো নিভে যায়নি ; শুধু তার রূপ বদলে যাচ্ছে।
জীবনও তেমন। শরীরের দীপ্তি কমে, কিন্তু বোধের আলো বাড়তে পারে। পথ ছোট হয়, কিন্তু দৃষ্টির গভীরতা বাড়ে। পৃথিবী থেকে কিছু কিছু দরজা বন্ধ হয়, অথচ অন্তরের কিছু দরজা প্রথমবারের মতো খুলে যায়।
সূর্যটা হেলে পড়েছে।
কিন্তু আলো জ্বলছে কিছুটা মৃদুছায়ায়।
এই জায়গাটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় দর্শন—হেলে পড়া আর শেষ হয়ে যাওয়া এক কথা নয়।
গাছ ফলের ভারে নুয়ে পড়ে। ধানের শীষ পাকার পর মাথা নিচু করে। পরিণত মানুষও তেমনি—জ্ঞান তাকে উদ্ধত করে না, বিনয়ী করে; অভিজ্ঞতা তাকে কঠিন করে না, গভীর করে।
বিকেলের সূর্য তাই আমাকে মৃত্যুর কথা যতটা মনে করায়, তার চেয়ে বেশি মনে করায় প্রজ্ঞার কথা।
দিনের শেষে সূর্য পৃথিবী থেকে কিছুই নিয়ে যায় না; শুধু তার আলোটুকু রেখে অস্ত যায়।
মানুষেরও তাই।
শেষ পর্যন্ত সম্পদ থাকে না, পদ থাকে না, পরিচয়ের জৌলুস থাকে না। থেকে যায় কারও মনে রেখে যাওয়া উষ্ণতা, কারও জীবনে দেওয়া আশ্রয়, কারও অন্ধকারে জ্বেলে যাওয়া সামান্য একটি আলো।
শেষ জীবনের দিকে তাকালে তখন মনে পড়ে—বাবার কঠোর মুখ, মায়ের হাতের গন্ধ, বন্ধুর সঙ্গে অকারণ হাসির দিন, প্রথম প্রেমের কাঁপা কাঁপা বিকেল, প্রিয় মানুষের সঙ্গে কাটানো নিরিবিলি দুপুর।
কিছু মুখ মনে পড়ে, যাদের আর কোনোদিন দেখা হবে না। কিছু কণ্ঠস্বর মনে পড়ে, যেগুলো আর কোনোদিন ডাকবে না।
তখন বোঝা যায়—মানুষ আসলে বয়সে বড় হয় না; মানুষ বড় হয় হারানোর মধ্য দিয়ে।
প্রতিটি বিচ্ছেদ তাকে একটু গভীর করে। প্রতিটি মৃত্যু তাকে একটু নীরব করে।
প্রতিটি ব্যর্থতা তাকে একটু বিনয়ী করে।
আর প্রতিটি ভালোবাসা তাকে শেখায়—নিজের বাইরে আরেকটি মানুষের জন্য হৃদয়ে জায়গা তৈরি করা কী আশ্চর্য মানবিকতা।
এক কাপ চা অনেক দীর্ঘ উপন্যাসের চেয়েও অর্থবহ হয়ে ওঠে।
একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর পৃথিবীর সমস্ত সংগীতের চেয়ে আপন লাগে।
এ এক অন্যরকম বিকেল।
দুপুরের উজ্জ্বলতা নেই, কিন্তু গভীরতা আছে। তারুণ্যের উচ্ছ্বাস নেই, কিন্তু মমতা আছে। স্বপ্নের উন্মাদনা নেই, কিন্তু স্বপ্নের অর্থ বোঝার ক্ষমতা আছে। আর আছে ফিরে তাকানোর অবকাশ।
সূর্য তখন প্রায় অস্তাচলে।
মনে হলো, সূর্য যেন বলছে—
‘হেলে পড়েছি বলে ভেবো না, আমি পরাজিত। আমি শুধু আমার আলোকে অন্য এক প্রান্তে নিয়ে যাচ্ছি।’
হয়তো জীবনও তাই।
আমরা ধীরে ধীরে হেলে পড়ি। চোখের নিচে ছায়া নামে, চুলে রূপালি রং লাগে, হাঁটার গতি কমে আসে, পরিচিত মুখের তালিকা ছোট হতে থাকে। একসময় মানুষের কাছে পৃথিবীর চেয়ে কয়েকটি প্রিয় মুখই বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে।
তবু জীবন শেষ হয়ে যায় না।
জীবন তখন স্মৃতির ভেতর দিয়ে বাঁচে, ভালোবাসার ভেতর দিয়ে বাঁচে, কারও মনে রেখে যাওয়া একটি বাক্যে বাঁচে, কারও চোখের জলে বাঁচে, কারও নীরব হাসিতে বেঁচে থাকে।
হয়তো এটাই মানুষের একমাত্র অমরত্ব—সে নিজে থাকে না, কিন্তু তার ভালোবাসা থেকে যায়; তার স্পর্শ থেকে যায়; তার বলা কিছু কথা থেকে যায়; তার জন্য কারও বুকের ভেতর একটি ছোট্ট আলো জ্বলে থাকে।
বিকেল শেষ হয়ে এলো।
আকাশে আর সূর্য নেই।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে আলোটা এখনও রয়ে গেছে।
আমি বুঝলাম—
জীবনেরও হয়তো এমনই।
একদিন মানুষ চলে যায়।
কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা থাকলে, তার আলো এত সহজে অস্ত যায় না।
সূর্য ডোবে।
দিন শেষ হয়।
মানুষ হেলে পড়ে।
জীবন একদিন থেমেও যায়।
তবু ভালোবাসা—
সে কোনো পশ্চিম আকাশ মানে না।
তার কোনো অস্তাচল নেই।

লেখকঃ

এম. আর. মামুন (ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া)