পুরনো বা ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির ঘোষণার আড়ালে আস্ত বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির অভিনব কৌশল উদঘাটন করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। মোংলা বন্দরে আসা একটি চালানে ৪টি বিলাসবহুল গাড়িকে মাত্র ৩ থেকে ৪টি বড় অংশে কেটে গাড়ির পার্টস হিসেবে ‘এসকেডি’ (সেমি নকডাউন) অবস্থায় দেশে আনা হয়েছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আল আমিন শেখ। এনবিআর জানায়, বিআরটিএ, কুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সহায়তায় শতভাগ কায়িক পরীক্ষা চালিয়ে অভিনব এই শুল্ক ফাঁকির অপচেষ্টা উন্মোচিত হয়েছে। আটককৃত গাড়িগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, মোংলা বন্দরের ই/ঊ ঘড়. ঈ-৬৯০৪ (উধঃব: ২০.০৪.২০২৬) এবং গধহরভবংঃ ঘড়. ২০২৬/২৫৬ নম্বরের চালানটিতে ১৪টি আইটেমে ১৬৪টি প্যাকেজ ছিল। যার মোট ঘোষিত ওজন ছিল ১০,২২০ কেজি। ঢাকার গেন্ডারিয়ার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘ক্রাউন অটো মোবাইল সার্ভিসেস’ চালানটি খালাসের দায়িত্ব দেয় খুলনার সিএন্ডএফ এজেন্ট এস. টি. ইন্টারন্যাশনালকে। জাপানভিত্তিক রপ্তানিকারক ‘মাহি কার পোর্ট’ থেকে ‘এমভি এমসিসি টোকিও’ জাহাজে করে চালানটি মোংলা বন্দরে পৌঁছায়। চালানের ইনভয়েস মূল্য দেখানো হয়েছিল মাত্র ৭ হাজার ৯৩৫ ইউএস ডলার (শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ৯ লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৭ টাকা)। এনবিআর জানায়, আমদানিকারক নথিপত্রে দরজা, ইঞ্জিন, গিয়ার বক্স, হেডলাইট, স্টিয়ারিং, বাম্পারের মতো ব্যবহৃত খুচরা যন্ত্রাংশের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সিআইআইডির মহাপরিচালকের কাছে থাকা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাস্টমস গোয়েন্দার খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় ও মোংলা সার্কেল চালানটির খালাস স্থগিত করে। গত ১৯ জুলাই চালানটির শতভাগ কায়িক পরীক্ষা চালানো হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, সাধারণ পার্টস হিসেবে খুচরা বিচ্ছিন্ন করার বদলে পুরো গাড়িগুলোকে ফ্রন্ট কাট, রিয়ার কাট ও রুফ কাট প্যানেল হিসেবে ৩-৪টি বড় অংশে কেটে আনা হয়েছে। ওয়ারিং হার্নেস, সেন্সরসহ গুরুত্বপূর্ণ সব অংশ সংযুক্ত ছিল, যা পুনরায় জোড়া দিলেই পূর্ণাঙ্গ গাড়িতে রূপ নেওয়া সম্ভব। পণ্যের খোদাই করা নম্বর, চিহ্ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি বিশ্লেষণ করে গাড়িগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি রেঞ্জ রোভার ভোগ, একটি বিএমডব্লিউ ৬৫০আই, একটি লেকশাস এলএক্স৫৭০ এবং একটি টোয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেটসহ মোট ৪টি পূর্ণাঙ্গ গাড়ির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। গাড়িগুলোর মধ্যে ২০১৭ সালের মডেলের যুক্তরাজ্যে তৈরি রেঞ্জ রোভার ভোগ গাড়িটির বাংলাদেশে আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা থেকে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ২০১০ মডেলের জার্মানির তৈরি বিএমডব্লিউ ৬৫০আই গাড়িটির বাজারমূল্য প্রায় ৬০ থেকে ৯০ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের জাপানি লেকশাস এলএক্স৫৭০ এসইউভির আনুমানিক বাজারমূল্য ২ কোটি থেকে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং জাপানে তৈরি টোয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট গাড়িটির সম্ভাব্য মূল্য ৩০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা। কাস্টমস কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এনবিআর জানায়, যেখানে ৪টি বিলাসবহুল গাড়ির মোট বাজারমূল্য সাড়ে ৪ কোটি থেকে ৬ কোটি টাকার বেশি হবে সেখানে, ৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দেখিয়ে আমদানিকারক মাত্র ৬ লাখ ১০ হাজার ৩০ টাকা শুল্ক-কর পরিশোধ করে চালানটি খালাসের চেষ্টা করছিল। ‘জিআরআই রুল ২(এ)’ অনুযায়ী খণ্ডিত অবস্থায় আনা কোনো পণ্যে যদি পূর্ণাঙ্গ পণ্যের মৌলিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে, তাহলে সেটিকে আস্ত পণ্য বা ‘এসকেডি’ মোটরযান হিসেবে শুল্কায়ন করতে হবে। আমদানিনীতি আদেশ ও কাস্টমস আইন-২০২৩ লঙ্ঘনের দায়ে চালানটি এসকেডি মোটরযান হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করে প্রতিবেদন মোংলায় কাস্টম হাউজে পাঠানো হয়েছে। চূড়ান্ত কারিগরি মূল্যায়নের পর ফাঁকি দেওয়া রাজস্বের সঠিক পরিমাণ নিরূপণ করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।