নানা চড়াইউৎরাই পেরিয়ে রাজনৈতিক পথচলায় দলের বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়েছেন সাবেক ডাকসু ভিপি আমানউল্লাহ আমান।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদে মনোনীত হয়েছেন ঢাকা-২ আসনের সংসদ সদস্য আমানউল্লাহ আমান।
এরই মধ্যে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চার নেতাকে স্থায়ী কমিটির সদস্য পদে মনোনীত করেছেন। তার মধ্যে আমানউল্লাহ আমান অন্যতম।
ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে
ঢাকার কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ইউনিয়নে ২৫ জানুয়ারি ১৯৬২ সালে জন্মগ্রহণ করেন আমানউল্লাহ আমান। তার পিতা মেঘু মিয়া এবং মা করিমন নেসা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সময়ই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মাধ্যমে আমানউল্লাহ আমানের রাজনৈতিক পথচলা শুরু। ছাত্রজীবনেই তিনি নেতৃত্বের দক্ষতার পরিচয় দেন। ১৯৯০-এর দশকে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ছাত্র ও সাধারণ জনগণকে সংগঠিত করার মধ্য দিয়ে ওই আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ছিলেন।
১৯৯০-৯১ শিক্ষাবর্ষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি নির্বাচিত হন। ডাকসুর এই নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে তার অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়।
প্রথমবার সংসদ সদস্য
ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশের পর ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আমানউল্লাহ আমান। ওই নির্বাচনে তিনি ৯৭ হাজার ২৯৯ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোস্তফা মোহসিন মন্টুকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
নির্বাচনি রাজনীতিতে তার ধারাবাহিক সাফল্যের কারণে পরবর্তী সময়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকেন এবং তার রাজনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়।
প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে
১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে আমানউল্লাহ আমানকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করা হয়। এ দায়িত্বে থাকাকালে তিনি জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে বিভিন্ন নীতি ও কার্যক্রমে ভূমিকা রাখেন।
২০০১ সালে বিএনপি পুনরায় সরকার গঠন করলে তিনি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। দুই দফায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
প্রতিকূলতার মধ্যেও দলে সক্রিয়
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা রাজনৈতিক চাপ, জেল-জুলুম ও ব্যক্তিগত প্রতিকূলতার মুখোমুখি হলেও তিনি দলের আদর্শ ও নীতির প্রতি অটল ছিলেন। গত ১৭ বছরে, বিশেষ করে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। এ সময়ে দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আস্থাও অর্জন করেন।
কেরানীগঞ্জে আমানউল্লাহ আমানের রাজনৈতিক প্রভাব দীর্ঘদিনের। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ এবং বিভিন্ন সংকটের সময় পাশে থাকার কারণে এলাকায় তার একটি শক্তিশালী জনভিত্তি তৈরি হয়েছে।
কেরানীগঞ্জে শক্ত অবস্থান
আমানউল্লাহ আমানের রাজনৈতিক প্রভাব শুধু নির্বাচনি সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কেরানীগঞ্জকে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আধুনিক ও উন্নত নগরী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন সময়ে কাজ করেছেন। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ, সহানুভূতি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তাকে কেরানীগঞ্জের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি ঢাকা-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন। এখন পর্যন্ত কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে তিনি পরাজিত হননি। তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভিত্তি ও জনপ্রিয়তার কারণে কেরানীগঞ্জে তার শক্ত অবস্থান রয়েছে।
দলীয় নেতৃত্বে নতুন দায়িত্ব
রাজনৈতিক জীবনে সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন আমানউল্লাহ আমান। এর আগে বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়কের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।
ছাত্র আন্দোলন থেকে সংসদীয় রাজনীতি, সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ—দীর্ঘ এই রাজনৈতিক পথচলায় আমানউল্লাহ আমান বিএনপির রাজনীতিতে একটি পরিচিত মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।