দিনের শেষ কর্মসূচি হিসেবে সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরের একটি পাঁচ তারকা হোটেলে চট্টগ্রাম বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। দলীয় সূত্র বলছে, সভায় নগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি এবং ১১টি অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের প্রায় ৫৫০ থেকে ৬০০ নেতা অংশ নেবেন। সেখানে দলের সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে নেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী।
বাঁশখালীতে ১০০ পরিবারকে নতুন ঘর
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি প্রস্তুতি চলছে বাঁশখালীর বাহারছড়া এলাকায়। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য সেখানে নতুন ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বাঁশখালী পৌরসভা ও উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন থেকে ১০০টি পরিবারকে ঘর দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। বন্যায় যেসব পরিবারের ঘর সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে এবং নতুন ঘর নির্মাণের সামর্থ্য নেই, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী প্রতীকীভাবে একজন স্বামীহারা নারীর হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দিয়ে ১০০ পরিবারের কাছে ঘর হস্তান্তর কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে।
বাঁশখালীতে অনুষ্ঠানস্থল, হেলিপ্যাড ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখেছেন বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী। সেখানে মঞ্চ, প্যান্ডেল ও হেলিপ্যাড প্রস্তুতের কাজও শেষ পর্যায়ে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ দেখা দিয়েছে। উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রস্তুতি সভা করে নেতা-কর্মীদের কর্মসূচিতে সুশৃঙ্খলভাবে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফটিকছড়িতে হেফাজতের সঙ্গে সাক্ষাৎ
বাঁশখালী থেকে প্রধানমন্ত্রী দুপুরের দিকে ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় যাবেন। সেখানে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন তিনি। এরপর সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের প্রায় ৫০ জন নেতার সঙ্গে মতবিনিময় করার কথা রয়েছে।
হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে এই কর্মসূচিকে অরাজনৈতিক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর শপথের সময় আমিরের সঙ্গে সাক্ষাতের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটি রাখতেই তাঁর এই সফর।
হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরী বলেন, সাক্ষাতের সময় ফটিকছড়ির উন্নয়ন ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হবে। এর মধ্যে ৫০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন, চট্টগ্রাম থেকে নাজিরহাট হয়ে রামগড় পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার দাবি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে বাবুনগর মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে প্যান্ডেল নির্মাণ, প্রবেশপথ সংস্কার ও পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। ফটিকছড়ির পেলাগাজিতে প্রধানমন্ত্রীর হেলিকপ্টার অবতরণের জন্য অস্থায়ী হেলিপ্যাডও প্রস্তুত করা হয়েছে।
হাটহাজারীতে পুনর্বাসন কর্মসূচি
ফটিকছড়ি থেকে সড়কপথে হাটহাজারীতে যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় গিয়ে প্রয়াত আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত করবেন। এরপর জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় কিছু সময় অবস্থান করে হাটহাজারী সরকারি কলেজ মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
হাটহাজারীর অনুষ্ঠানকে ঘিরে মাঠে মঞ্চ তৈরির কাজ চলছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সড়ক সংস্কার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও কাজ করছেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের পক্ষ থেকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৩০টি পরিবারকে ঘর নির্মাণের সহায়তা হিসেবে এক লাখ টাকা করে দেওয়ার কথা রয়েছে। একই অনুষ্ঠানে ১৫ জন প্রতিবন্ধীকে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে হাটহাজারীর বিভিন্ন ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ওয়ার্ডে বিএনপি এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকেও প্রস্তুতি চলছে। আশপাশের উপজেলা থেকেও নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
সাংগঠনিক সভায় থাকছেন ৫৫০-৬০০ নেতা
চট্টগ্রাম সফরের শেষ পর্যায়ে নগরের একটি পাঁচ তারকা হোটেলে বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সভায় চট্টগ্রাম নগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির পাশাপাশি ১১টি অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের প্রতিনিধিরা থাকবেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম বাংলানিউজকে বলেন, তিন সাংগঠনিক ইউনিটের বিএনপি ও ১১টি অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের প্রায় ৫৫০ থেকে ৬০০ নেতা-কর্মী সভায় অংশ নেবেন। নগর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির কমিটির সদস্য এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের পাশাপাশি উত্তর জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত থাকায় জ্যেষ্ঠ নেতাদের সমন্বয়ে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে।
দলীয় নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের সরাসরি মতবিনিময়ের এই উদ্যোগকে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। এতে চট্টগ্রামের সাংগঠনিক পরিস্থিতি, স্থানীয় সমস্যা ও দলীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে নেতারা সরাসরি কথা বলার সুযোগ পাবেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের এটি চট্টগ্রামে প্রথম সফর। এর আগে গত ২৫ জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে আয়োজিত জনসভায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। তারও আগে ২০০৫ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে দলীয় কর্মসূচিতে তিনি চট্টগ্রামে এসেছিলেন।
এবারের সফরে উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন, বন্যাদুর্গত মানুষের পুনর্বাসন, হেফাজতের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং দলীয় সাংগঠনিক সভাসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি থাকায় প্রধানমন্ত্রীর একদিনের চট্টগ্রাম সফরকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। রোববার রাত ৯টা ২০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকার উদ্দেশে চট্টগ্রাম ত্যাগ করার কথা রয়েছে।