জানা নিউজ

সম্পাদকীয়

এইচআইভি সংক্রমণ বৃদ্ধির সতর্কবার্তা

কুমিল্লায় চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে এইচআইভি সংক্রমণে সাতজনের মৃত্যু এবং ৩৭ জন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। যদিও সংখ্যাটি সামগ্রিক জনসংখ্যার তুলনায় বড় নয়, তবে সংক্রমণের প্রবণতা ও ধরন বিশ্লেষণ করলে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে এইচআইভি শনাক্তের হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০১৯ সালে ২২৬টি পরীক্ষায় ১৫ জন আক্রান্ত শনাক্ত হলেও ২০২৫ সালে ১ হাজার ৪৪২টি পরীক্ষায় ৭২ জনের শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি পাওয়া যায়। চলতি বছরের মাত্র পাঁচ মাসেই ৩৭ জন শনাক্ত হয়েছেন। বছরের বাকি সময়েও একই ধারা অব্যাহত থাকলে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো সংক্রমণের ধরনে পরিবর্তন। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অধিকাংশ নতুন সংক্রমণ যৌনবাহিত। বিশেষ করে সমকামি যৌনসম্পর্ক সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার বেশি দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি যৌনকর্মী, প্রবাসফেরত ব্যক্তি এবং সংক্রমিত জীবনসঙ্গীর মাধ্যমে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। এটি প্রমাণ করে যে, এইচআইভি এখন আর নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর সমস্যা নয়; বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরে এর ঝুঁকি বিদ্যমান। এইচআইভি নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার, লজ্জা ও গোপনীয়তার সংস্কৃতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অনেকেই সংক্রমণের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা করাতে অনীহা দেখান। ফলে রোগ দেরিতে শনাক্ত হয় এবং চিকিৎসা শুরুর সুযোগ কমে যায়। এর ফলে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি অন্যদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে। তবে আশার বিষয় হলো, বর্তমানে এইচআইভি আর আগের মতো অনিবার্য মৃত্যুদণ্ড নয়। আধুনিক অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল চিকিৎসার মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। সরকার বিনামূল্যে পরীক্ষা ও ওষুধ সরবরাহ করছে, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এই সুবিধার পূর্ণ সুফল পেতে হলে আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রচার এবং গোপনীয়তা নিশ্চিত করে পরীক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এইচআইভি মোকাবিলায় ভয় বা সামাজিক কলঙ্ক নয়, বরং বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা, প্রতিরোধ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।