জানা নিউজ

রূপালি পর্দার ‘ট্র্যাজেডি কুইন’, বাস্তব জীবনে বিষাদের দীর্ঘ ছায়া

ঝলমলে আলো আর করতালির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর নিঃসঙ্গতা। বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেত্রী মীনা কুমারী, যাকে দর্শক ‘ট্র্যাজেডি কুইন’ নামে চিনে, তার জীবন যেন ছিল এক অন্তহীন বিষাদের গল্প। পর্দায় অসামান্য সাফল্য পেলেও ব্যক্তিজীবনে তিনি বয়ে বেড়িয়েছেন অজস্র যন্ত্রণা, যা শেষ পর্যন্ত তাকে অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

ষাটের দশকে বলিউডে নিজের অভিনয়, কণ্ঠ আর ব্যক্তিত্ব দিয়ে আলাদা জায়গা করে নেন মীনা কুমারী। কিন্তু মাত্র ১৮ বছর বয়সেই তার জীবনে আসে বড় মোড়। নিজের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বয়সী, বিবাহিত ও দুই সন্তানের বাবা পরিচালক কামাল আমরোহীর প্রেমে পড়েন তিনি। ভালোবাসার টানে সামাজিক বাধা উপেক্ষা করে গোপনে বিয়ে করেন। তবে সেই সম্পর্কই পরে হয়ে ওঠে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটের কারণ।

বিয়ের পর মীনার জীবন ধীরে ধীরে এক বন্দিদশায় পরিণত হয়। স্বামী কামালের কঠোর নিয়মের বেড়াজালে আটকে পড়েন তিনি। নতুন সিনেমায় কাজের বাধা, মেকআপ রুমে বাইরের কাউকে প্রবেশ নিষেধ, এমনকি সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বাড়ি ফেরার নির্দেশ, সব মিলিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। একসময় সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। ভালোবাসা থাকলেও স্বামীর অহংকারই বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিচ্ছেদের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন মীনা কুমারী। নিঃসঙ্গতা আর অনিদ্রা তাকে গ্রাস করে। চিকিৎসকের পরামর্শে ব্র্যান্ডি নেওয়া শুরু করলেও তা দ্রুতই আসক্তিতে রূপ নেয়। অনিয়ন্ত্রিত মদ্যপানের ফলে তিনি আক্রান্ত হন লিভার সিরোসিসে। জীবনের শেষ পর্যায়ে স্বামী সম্পর্ক জোড়া লাগাতে চাইলেও অভিমানী মীনা আর ফিরে তাকাননি।

১৯৭২ সালে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে এই তারকা না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি অভিনয় করেছেন প্রায় ৯০টি সিনেমায় এবং অর্জন করেছেন চারটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। ‘পাকিজা’, ‘সাহিব বিবি অউর গুলাম’ এবং ‘বৈজু বাওরা’সহ একাধিক কালজয়ী সিনেমা আজও তার প্রতিভার সাক্ষ্য বহন করে।

মৃত্যুর পর তার ডায়েরি, কবিতা এবং ব্যক্তিগত লেখাগুলো গীতিকার গুলজারের সম্পাদনায় ‘তানহা চাঁদ’ নামে প্রকাশিত হয়। সেসব লেখাতেও ফুটে উঠেছে তার একাকীত্ব আর না বলা কষ্টের গল্প।

মীনা কুমারী নেই, কিন্তু তার অভিনয় আর জীবনের বিষাদমাখা গল্প আজও দর্শকদের হৃদয়ে নাড়া দেয়। রূপালি পর্দার সেই উজ্জ্বল মুখের আড়ালে যে এতটা অন্ধকার ছিল, তা তাকে আরও বেশি স্মরণীয় করে রেখেছে।