২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৬ সালের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত ওই অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। এ সময় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনানিবাসে গৃহবন্দি করা হয়। সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে এবং দেশজুড়ে রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে।
সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমানের মুক্তি
জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি জেড ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন এবং সেনাবাহিনীর একটি অংশের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁকে বন্দি করার ঘটনা সেনানিবাসের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি করে।
৬ নভেম্বর দিবাগত রাত থেকে ৭ নভেম্বর ভোরে ঢাকা সেনানিবাসে সিপাহিদের মধ্যে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ সেনাসদস্যদের একটি অংশ অস্ত্র হাতে বেরিয়ে আসেন। তাঁদের সঙ্গে সাধারণ মানুষেরও অংশগ্রহণ ঘটে। এ সময় বিভিন্ন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে সেনানিবাস ও আশপাশের এলাকা।
একপর্যায়ে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে তিনি আবারও সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে সামনে আসেন। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বেও তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন
৭ নভেম্বরের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। জিয়াউর রহমান পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন। তার শাসনামলে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তাঁর শাসনামলে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমের সুযোগ বাড়ে এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসে। একই সঙ্গে তিনি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণার প্রবর্তন করেন, যা দেশের বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষকে জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করার রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়।
তাঁর শাসনামলে কৃষি, শিল্প ও অর্থনীতির উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৯৭৮ সালে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠিত হয়।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও ২০২৬-এর রাজনৈতিক বাস্তবতায় ৭ নভেম্বরের প্রাসঙ্গিকতা
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন ঘটে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘদিন ধরে দেশে ভোটাধিকার হরণ, গুম, খুন, দমন-পীড়ন ও দুর্নীতির মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের দাবি জোরালো হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক আদর্শকে ধারণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে বিএনপির কাছে ৭ নভেম্বরের চেতনা জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলমগীর হোসেন সম্রাট বাংলানিউজকে বলেন, স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য অত্যন্ত স্পষ্ট-জনগণের ঐক্য ও দেশপ্রেমের সামনে কোনো চক্রান্তই টিকতে পারে না। ২০২৬ সালের নতুন বাংলাদেশে শহীদ জিয়ার আদর্শ এবং ৭ নভেম্বরের চেতনা ধারণ করে বিএনপি সরকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার, সাম্য ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার পথে এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামে ৭ নভেম্বরের ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।