সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন- যা বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের একটি অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। এই বন তার জীববৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত। বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং চিত্রা হরিণের জন্য। সেই সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান আশ্রয়স্থল। কিন্তু এই অপরূপ সৌন্দর্যের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে এক কালো অধ্যায়ের নাম ‘দস্যুতা’। জেলে, বাওয়ালি এবং মৌয়ালদের কাছে সুন্দরবন যেমন মায়ের কোল, তেমনি দস্যুদের উপদ্রবে তা একসময় পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে। সুন্দরবনের দস্যুতার ইতিহাস বেশ পুরনো। এর ভৌগোলিক গঠনই যেন অপরাধীদের জন্য এক প্রাকৃতিক দুর্গ। অসংখ্য নদী-খাল, ঘন জঙ্গল আর জনবিচ্ছিন্ন দুর্গম এলাকাগুলো দস্যুদের আত্মগোপন এবং কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য আদর্শ স্থান। দারিদ্র্য, বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে আশির দশক থেকে এখানে সংঘটিত দস্যুতার বিস্তার ঘটতে থাকে। বাওয়ালি, মৎস্যজীবী ও মধু সংগ্রাহকরা বছরের পর বছর ধরে এই বনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। একসময় বনদস্যুদের দাপটে এসব পেশাজীবীর জীবন ছিল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় এবং শারীরিক নির্যাতনের মতো নির্মম ঘটনা ছিল নিত্যদিনের চিত্র। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর ছয়টি দস্যু বাহিনীর ৫৪ সদস্য আত্মসমর্পণ করে। ওই দিনই সুন্দরবনকে আনুষ্ঠানিকভাবে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু হতাশার দিক হলো, এখনো পুরোপুরি নিরাপদ হয়নি সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন-জীবিকা। বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জানা গেছে, এখনো জেলে ও বনজীবীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে বিভিন্ন দস্যু বাহিনী। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সুন্দরবনে সক্রিয় রয়েছে অন্তত ১১টি দস্যু বাহিনী। সুন্দরবনকে চিরতরে দস্যুমুক্ত রাখতে হলে একটি বহুমাত্রিক ও টেকসই পরিকল্পনা দরকার। শুধু শক্তি প্রয়োগ বা অভিযান দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এই লক্ষ্যে, প্রথমত আইন প্রয়োগ ও নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। র্যাব, কোস্ট গার্ড ও পুলিশের সমন্বয়ে সুন্দরবনের দুর্গম এলাকাগুলোতে নিয়মিত ও আকস্মিক টহল বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, যেমনÑ ড্রোন ও জিপিএস ট্র্যাকিং ব্যবহার করে দস্যুদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এর পাশাপাশি, আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের জন্য শুধু এককালীন আর্থিক সহায়তা নয়, বরং তাদের দক্ষতা অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সুন্দরবন আমাদের জাতীয় অহংকার এবং প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। একে সুরক্ষিত রাখা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।