ধবধবে সাদা ইহরাম কাপড়ে আবৃত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ১৫ লক্ষাধিক ধর্মপ্রাণ মুসলমান আজ মঙ্গলবার সমবেত হয়েছেন সৌদি আরবের ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে। বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনি। বর্ণ, ভাষা ও জাতীয়তার ভেদাভেদ ভুলে মুসলিম উম্মাহর এই মহাসমাবেশ আজ পরিণত হয়েছে এক অভূতপূর্ব মিলনমেলায়। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, জিলহজ মাসের ৯ তারিখে আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাই হজের প্রধান ফরজ বা রোকন, এই পবিত্র প্রাঙ্গণে উপস্থিতি ছাড়া হজ পূর্ণাঙ্গ হয় না।
ভোর হতেই হাজিদের দল ‘জাবালে রহমত’ বা দয়ার পাহাড়ের দিকে এগোতে থাকে। ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় আগে এই পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়েই মানবজাতির উদ্দেশ্যে বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। আজ সেই স্মৃতিবিজড়িত স্থানে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ ও রহমত কামনায় দুই হাত তুলে কান্নায় ভেঙে পড়েন লাখো হাজি। পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয় এক পরম ভাবগম্ভীর ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ। মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই প্রান্তরটি বছরের বাকি সময় সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকলেও, হজের এই বিশেষ দিনে তা হয়ে ওঠে মুসলিম বিশ্বের হৃদস্পন্দন।
বিশাল এই জনসমুদ্রের নিরাপত্তা ও যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে সৌদি প্রশাসন কঠোর ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের নেওয়া বড় ধরনের প্রস্তুতির কারণে হাজিরা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে আরাফার ময়দানে পৌঁছাতে পেরেছেন।
সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাউন্ট আরাফাত হাসপাতালসহ মাঠ পর্যায়ের সব ক্লিনিক, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং অ্যাম্বুলেন্স ইউনিটকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে, যাতে হাজিদের যেকোনো শারীরিক অসুস্থতায় তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া যায়। পাশাপাশি পাহাড়ের উঁচুতে বা দুর্গম অংশে যেকোনো দুর্ঘটনা এড়াতে আধুনিক সরঞ্জামসহ মোতায়েন রয়েছে সিভিল ডিফেন্সের বিশেষ উদ্ধারকারী দল।
পবিত্র স্থানগুলোতে হাজিদের রাতের যাতায়াত নিরাপদ করতে পৌরসভা ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয় বিশেষ আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করেছে। প্রায় ৫ হাজার লাইট টাওয়ার ও পোলের মাধ্যমে ২০ হাজারেরও বেশি আধুনিক আলো ছড়ানো হয়েছে এবং মক্কা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা জুড়ে প্রায় ২ লাখ লাইটিং ইউনিটের রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে যাতে রাতভর নিরবচ্ছিন্ন সেবা বজায় থাকে।
পবিত্র এই ময়দানে সারাদিন ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকার পর, সূর্যাস্তের সাথে সাথেই হাজিরা পরবর্তী গন্তব্য মুজদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। আর এর মাধ্যমেই কয়েক ঘণ্টার জন্য প্রাণ ফিরে পাওয়া ঐতিহাসিক আরাফাত ময়দান আবারও পরবর্তী বছরের জন্য শান্ত ও জনমানবহীন রূপ ধারণ করবে।