বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার সময় মিয়ানমারের নৌবাহিনীর হাতে আটক লক্ষ্ণীপুরের রামগতি উপজেলার ৮ জনসহ একই ট্রলারে থাকা ১৫ জেলে ৬ মাস ধরে বন্দি রয়েছে মিয়ানমারের কারাগারে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা বন্দি থাকায় পরিবারগুলো অনাহার-অর্ধাহারে দিন পার করছেন। গত ২৫ মার্চ বিকেলে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সেন্টমার্টিনের অদূরে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের জলসীমানা থেকে ট্রলারসহ তাদের আটক করা হয়। একই ট্রলারসহ আটক জেলেদের মধ্যে রামগতি উপজেলার ৯ জন এবং অন্য ৭ জন কমলনগর, নোয়াখালীর সুবর্ণচর, চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, ভোলার দৌলতখান উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। আটকদের মধ্যে উপজেলার চর গজারিয়া এলাকার আবু তাহেরের ছেলে মো. তাহমীদ (১৫) ৫ সেপ্টেম্বর রাতে বাবা-মায়ের কাছে ফিরে এসেছে। তাহমীদ প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্যদেরকে অনুপ্রবেশের অভিযোগে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দিয়ে মিয়ানমারের কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছে বলে মিয়ানমারের রাখাইনে বাংলাদেশ মিশনের একটি সূত্র জানিয়েছেন। মিয়ানমার কারাগারে বন্দি জেলেরা হলেন লক্ষ্ণীপুরের রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার এলাকার মো. জুয়েল (৩০), বালুরচর সোনালী গ্রামের ফরহাদ হোসেন (২১), চর পোড়াগাছা এলাকার মো. নিরব (৩৮), মো. রাকিব হোনের (৩০), সাদ্দাম হোসেন (৩২), চর গজারিয়া এলাকার মেজবাহ উদ্দিন (৪১), একই এলাকার মো. তামজিদ (২০), দক্ষিণ টুমচরের মো. লিটন (৩০), কমলনগর উপজেলার চরজগবন্ধুর এলাকার মো. অজিউল্যাহ (৬০), নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরপনাউল্যাহ এলাকার মো. শাজাহান (৪১), একই এলাকার মো. সোহাগ (১৯), উত্তর চরবাগ্গা এলাকার জাবের হোসেন (৩৬), ভোলার দৌলতখান উপজেলার চরছোট লামছিধলী এলাকার মো. সাইমুন (১৯), চট্টগ্রামের পাহাড়তলী উত্তরকাট্টলি এলাকার মো. কামাল হোসেন (৪৩) এবং কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার নয়াপাড়া এলাকার তারেক রহমান (২৫)। মিয়ানমার থেকে বাড়ি আসা তাহমীদ জানান, কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার বাসিন্দা মিজানুর রহমানের মালিকানাধীন ‘এফবি মা বাবার দোয়া’ নামের একটি ট্রলার কামাল হোসেন মাঝির নেতৃত্বে ১৬ জন জেলে সাগরে মাছ ধরতে যান। তারা বাংলাদেশ-মিয়ানমারের জলসীমানায় মাছ ধরছিলেন। এ সময় মিয়ানমারের নৌবাহিনী তাদের ট্রলার লক্ষ্য করে গুলি করে। গুলিতে তাদের ট্রলারের মাঝি কামাল, সাদ্দাম, লিটন, জুয়েলসহ ৪ জন আহত হয়। পরে নৌবাহিনী সাগর থেকে তাদেরকে ট্রলারসহ আটক করে মিয়ানমারে নিয়ে যায়। সেখানে আহতদের একটি হাসপাতালে ভর্তি করে এবং বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে রাখা হয়। তাহমীদ অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাকে ছেড়ে দিয়ে স্থানীয় একজন ইউপি মেম্বারের জিম্মায় রাখা হয়। তাহমীদ আরও জানায়, কারাগারে জেলেদের নানাভাবে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে। তাদের পর্যাপ্ত খাবার ও প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। অনেকে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বন্দিদের মধ্যে তাহমীদের ভাই তামজিদও রয়েছে। এদিকে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি মাসের পর মাস মিয়ানমারের জেলে আটক থাকার ফলে অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য আর চরম হাহাকারে দিন কাটছে উপকূলীয় আটক জেলেদের পরিবারগুলোর। একদিকে প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আকুল আকুতি, অন্যদিকে সংসার চালানো ও সন্তানদের মুখে দুবেলা দুমুঠো ভাত তুলে দেওয়ার কঠোর সংগ্রাম। সব মিলিয়ে তাদের জীবন এখন এক চরম দুর্বিষহ অবস্থায় রয়েছে। অনেক পরিবার অর্থকষ্টে পড়ে অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। তাদের ফেরাতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন সময়ে সভা-সমাবেশ করে এবং একই সাথে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ক্লান্ত স্বজনরা। স্বজনরা বলছেন, মিয়ানমারে আটক জেলেদের নানাভাবে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে। তাদের পর্যাপ্ত খাবার ও প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে আটক জেলেদের দ্রুত দেশে ফেরানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা। চর পোড়াগাছা ইউনিয়নের ভূলুয়া নদীর পাড়ে বসবাসরত জেলে নিরবের স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার জানান, তাদের কোনো ভিটামাটি নেই। নদীর পাড়ে ছোট একটি ঘর তুলে শাশুড়ি, দুই ননদ, দুই মেয়েকে নিয়ে বসবাস করে। নিরবই পরিবারের একমাত্র উপার্জন করার ব্যক্তি। নিরব আটক হওয়ায় তাদের পরিবারে নেমে এসেছে চরম দুর্বিষহ অবস্থা। চর আলেকজান্ডার ইউনিয়নের বালুরচর সোনালী গ্রামের ফরহাদ হোসেনের মা ফরিদা বেগম বলেন, নদীভাঙনের কবলে পড়ে ভিটেমাটি হারিয়ে তারা এখন নিঃস্ব। ফরহাদের বাবা দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে বাড়িতে পড়ে আছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ফরহাদই ছিল। ৪ জনের পরিবার নিয়ে দুর্বিষহ দিন পার করছেন বলে জানান ফরহাদের মা ফরিদা বেগম। স্থানীয় চর পোড়াগাছা ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল আমিন জানান, মিয়ানমারের কারাগারে আটক জেলেদের কয়েকজন এই ইউনিয়নের বাসিন্দা। তাদের কোনো ভিটামাটি নেই। ভূলুয়া নদীর পাড়ে বসবাস করছে। অর্থকষ্টে দুর্বিষহ জীবন পার করছে পরিবারগুলো। উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, আটক জেলেদের ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যের সিতওয়েতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের কনসাল ও মিশন প্রধান আবদুল্যাহ আল রাজি মোবাইল ফোনে জানান, রামগতির ৮ জনসহ প্রায় ১৮০ জন বাংলাদেশের নাগরিক মিয়ানমারের বিভিন্ন কারাগারে আটক আছে। এদের বেশির ভাগ সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে জলসীমা অতিক্রম করায় আটক হয়েছে। কারও কারও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়েছে। বাংলাদেশ মিশনের পক্ষ থেকে সবার মুক্তির জন্য মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার বরাবর একটি আবেদন দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার যদি ক্ষমা করে মুক্তি দেয়, তাহলে এসব নাগরিককে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো যাবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, জেলেরা আটক হওয়ার পর থেকেই তাদের ফেরত আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এটি একটি আন্তর্জাতিক বিষয়। মিয়ানমারে বাংলাদেশ মিশন এ বিষয়ে কাজ করছে। আশা করি অল্প সময়ের মধ্যে বন্দি জেলেদের ফিরিয়ে আনা যাবে।