জানা নিউজ

মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে সর্বোচ্চ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ

দীর্ঘ প্রায় ১৭ মাস পর দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। যথাযথ নিয়মনীতি প্রণয়ন করে ব্যবসায়ীদের নীতি সহায়তা প্রদানে প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহন করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। এর ফলে স্বল্প ডাউন পেমেন্টে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন, গ্রেস পিরিয়ড এবং আংশিক অবলোপনের সুযোগ পাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার নানা উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যাংকখাত সংস্কারেও গুরুত্ব দিয়েছেন। নজিরবিহীন খেলাপি ঋণের চাপ কমাতে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে নীতিসহায়তার ঘোষণা দেন তিনি। মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে সর্বোচ্চ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দিয়েছেন। ফলে ঋণগ্রহীতারা দুই বছর পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড পাচ্ছেন।পুনঃতফসিলের সুদহার সংশ্লিষ্ট খাতের সর্বনিম্ন সুদের চেয়েও ১ শতাংশ কম নির্ধারণ করা যাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, জাল জালিয়াতি বা প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া ঋণ, কিংবা ব্যাংক কর্তৃক ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে ঘোষিতরা এই সুবিধা পাবেন না। কেবল প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতার ক্ষতির পরিমাণ এবং প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার সম্ভাবনা যাচাই করেই পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন বা এক্সিট পরিকল্পনার মেয়াদ নির্ধারণ করতে হবে।

নীতিমালায় আরও বলা হয়, ৩০০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তির প্রয়োজন নেই।

বিধি বিধান মেনে ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্পর্কের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এসব আবেদন নিষ্পত্তি করতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ তারাও সর্বোচ্চ চারবার ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের সুযোগ থাকবে। এসব খেলাপি ঋণ পরিশোধে সর্বোচ্চ ২১ বছর পর্যন্ত সময় পেতে পারেন।এ ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমে গতি আনতে বড় করপোরেট ঋণখেলাপিসহ প্রায় ২৫০টি প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ পুণঃতফসিল সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত পাঁচ থেকে ১৫ বছর সময়, ন্যূনতম ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট এবং সর্বোচ্চ তিন বছর গ্রেস পিরিয়ড দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন গভর্নর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সরকার পরিবর্তনের আগে গত জুনে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা এবং গত বছরের ডিসেম্বরে ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

এই প্রেক্ষাপটে গতবছরের ৭ ডিসেম্বর ব্যাংকার্স সভায় বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে বৈঠকে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর খেলাপি ঋণ আদায়ে জোরদার পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি ব্যাংকগুলোর এমডিদের ঋণ পুনর্গঠন ও আংশিক অবলোপন সুবিধা কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন।

গত ৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে মন্দ ও ক্ষতিজনক শ্রেণির এবং আদায়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ ঋণ আংশিক অবলোপনের অনুমোদন দেয়। মূলত ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিটে খেলাপি ঋণের চাপ কমাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন জানান, ঋণগ্রহীতা ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের লক্ষ্যে জারি করা নীতিসহায়তা সার্কুলারগুলো কঠোরভাবে পরিপালনের নির্দেশ দিয়েছেন গভর্নর।

গভর্নর কৃষি খাতে ঋণপ্রাপ্তির বৈষম্যের বিষয়ে সম্প্রতি ব্যাংকার্স সভায় বলেন, দেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৪ দশমিক ১৫ শতাংশ, অথচ মোট ঋণের মাত্র ২ শতাংশ যায় এই খাতে। তিনি কৃষি ঋণ বাড়িয়ে ১০ শতাংশের বেশি করার পরামর্শ দেন।

একই সঙ্গে এসএমই ও সিএমএসএমই খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়ে ওই সভায় গভর্নর বলেন, সিএমএসএমই ঋণের প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এ খাতে উৎসাহ দিতে প্রভিশনিং ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০ দশমিক ৫ শতাংশে নামানোর আশ্বাসও দেন গভর্নর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিসহায়তা ও পুনর্গঠন উদ্যোগ একদিকে যেমন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ সমস্যার বাস্তব চিত্র সামনে এনে তা কমানোর পথও তৈরি করছে।