জানা নিউজ

মবসন্ত্রাসকে রুখে দিতে হবে

সম্পাদকীয়

মব-সন্ত্রাস বলতে বোঝায়-আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া একদল মানুষের সম্মিলিত সহিংস আচরণ। এটি কখনো ধর্মীয় গুজবকে কেন্দ্র করে, কখনো চুরি বা অপবাদকে ঘিরে, কখনো রাজনৈতিক উত্তেজনা কিংবা সামাজিক বিদ্বেষ থেকে জন্ম নেয়। মবের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—এটি কোনো যুক্তি শোনে না, সত্য যাচাই করে না এবং ভুল স্বীকার করতে জানে না। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্রভাণ্ডার বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয় বরং তার আইন, ন্যায়বিচার এবং নাগরিকদের পারস্পরিক আস্থাই মূল শক্তি। এই তিনটি স্তম্ভ যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্র দৃশ্যত টিকে থাকলেও ভেতরে ভেতরে অদৃশ্য এক অরাজকতার দিকে এগিয়ে যায়। বাংলাদেশ আজ ঠিক এমনই এক সংকটময় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। যেখানে মব-সন্ত্রাস অর্থাৎ দলবদ্ধ উন্মত্ত সহিংসতা সমাজের গভীরে নীরবে নয় সরবে শিকড় গাড়ছে। মব-সন্ত্রাস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি মানসিকতা। এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয় বরং এটি এক গভীর সামাজিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যাধির প্রকাশ। যখন ব্যক্তি নিজের বিবেক, যুক্তি ও মানবিক দায়িত্ব বিসর্জন দিয়ে ভিড়ের অংশ হয়ে যায়, তখন সন্দেহই রায় হয়ে দাঁড়ায়, আর ন্যায়বিচারের জায়গা দখল করে নেয় প্রতিশোধস্পৃহা। একটি সভ্য রাষ্ট্রে বিচার হয় আদালতে, প্রমাণ ও যুক্তির ভিত্তিতে। কিন্তু মব কালচারে সে ন্যায্যতার কোনো স্থান থাকে না। থাকে কেবল গুজব, উত্তেজনা এবং সহিংসতা। এতে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয় নির্দোষ মানুষ এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থা। গণপিটুনির মতো অপরাধ সমাজে এক ধরনের অরাজকতা ও ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছে। বলা বাহুল্য, মবসন্ত্রাস, অজ্ঞাত পরিচয় লাশ উদ্ধার, রাজনৈতিক সহিংসতায় হতাহতের ঘটনা ইত্যাদি আইন-শৃংখলার এক নাজুক চিত্রই তুলে ধরে। সরকার আইন-শৃংখলা সুরক্ষা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। মবসন্ত্রাস আগে ছিল না, এমন দাবি করা যায় না। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে মবসন্ত্রাস, গুম, খুন, অপহরণ ইত্যাদি অপকর্ম ও অপরাধ মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সরকার যখন ফ্যাসিস্ট হয়, সন্ত্রাসী হয়, তখন অপরাধের চাষাবাদ সীমা অতিক্রম করে যায়। আইনের শাসন ও সুবিচার বলতে যা বুঝায়, তার অস্তিত্ব লুপ্ত হওয়াই স্বাভাবিক। এমন একটি দীর্ঘ সময় দেশের মানুষের দেখতে হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাশীন হওয়া সরকারের সময় মবসন্ত্রাস, বেওয়ারিশ লাশের মিছিল, রাজনৈতিক সহিংসতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে কেন থাকবে, সেটাই প্রশ্ন। জীবনের চেয়ে মূল্যবান কিছু নেই। জীবনের নিরাপত্তা, মালামালের নিরাপত্তা, ইজ্জত-সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই রাষ্ট্র-সরকার-প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির জন্ম। মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্র-সরকার-প্রতিষ্ঠানের যে চুক্তি, তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র-সরকার-প্রতিষ্ঠান সব ধরনের নিরাপত্তা দিতে বাধ্য। একই সঙ্গে আইনের শাসন ও সুবিচার নিশ্চিত করার দায়িত্বও তাদের।