জানা নিউজ

“বিবেকই শ্রেষ্ঠ আদালত”-এই কথাটি নিঃশর্তভাবে সত্য নয়। বরং বলা উচিত “সত্যভিত্তিক জ্ঞান দ্বারা আলোকিত বিবেকই মানুষের শ্রেষ্ঠ আদালত

ধর্ম দর্শন

বিবেক: জ্ঞানের আত্মদর্শন নাকি সত্যের চূড়ান্ত আদালত? মানবসভ্যতার ইতিহাসে “বিবেক” শব্দটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি ধারণা। যুগে যুগে দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক ও চিন্তাবিদগণ মানুষকে তার বিবেক অনুসরণ করার উপদেশ দিয়েছেন। আজও আমরা প্রায়শই শুনি—“তোমার বিবেকের কথা শোনো “বিবেকই মানুষের শ্রেষ্ঠ আদালত, কিংবা “বিবেকের কাছে জবাবদিহি করতে হবে”। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিবেক কি সত্যিই সর্বদা নির্ভুল? বিবেক কি সত্য-মিথ্যার চূড়ান্ত মানদণ্ড? নাকি বিবেক নিজেই অন্য কিছুর উপর নির্ভরশীল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধান করতে গেলে প্রথমেই আমাদের বিবেকের প্রকৃতি বুঝতে হবে। বিবেক কী? বিবেক কোনো স্বতন্ত্র জ্ঞানের উৎস নয়। বরং এটি মানুষের অর্জিত জ্ঞান, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার অভ্যন্তরীণ বিচারশক্তি। অন্যভাবে বলা যায়, বিবেক হলো জ্ঞানের আত্মদর্শন। মানুষ যা জানে, যা বিশ্বাস করে এবং যা সত্য বলে গ্রহণ করে, বিবেক সেই জ্ঞান ও বিশ্বাসের আলোকে তার কর্মকে মূল্যায়ন করে। একজন চোর যখন চুরি করতে যায়, তখন তার অন্তরে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। কারণ সে জানে চুরি অপরাধ। তার বিবেক তাকে সতর্ক করে। কিন্তু এই সতর্কবার্তার উৎস বিবেক নিজে নয়; বরং চুরি যে অন্যায়, সেই পূর্ববর্তী জ্ঞান। অতএব, বিবেককে একটি আয়নার সঙ্গে তুলনা করা যায়। আয়না নিজে কিছু সৃষ্টি করে না; বরং যা তার সামনে থাকে, সেটিই প্রতিফলিত করে। জ্ঞান যদি সঠিক হয়, বিবেকও সঠিক প্রতিফলন দেবে। জ্ঞান যদি বিকৃত হয়, বিবেকও বিকৃত প্রতিফলন দেখাবে। সকলের বিবেক কি একইভাবে কাজ করে? বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর সকল মানুষের বিবেক একরকম নয়। কারণ তাদের জ্ঞান, বিশ্বাস ও মূল্যবোধ এক নয়। একজন বৌদ্ধ জীবহত্যাকে গুরুতর পাপ মনে করেন। ফলে তার বিবেক তাকে জীবহত্যা থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করবে। অন্যদিকে একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী বলিপ্রথাকে ধর্মীয় পুণ্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। তার বিবেক সেই কাজকে সমর্থন করবে। একজন হিন্দু মূর্তিপূজাকে ভক্তির বহিঃপ্রকাশ মনে করেন। তার বিবেক তাকে সেই কাজে উৎসাহিত করতে পারে। কিন্তু একজন মুসলমানের কাছে মূর্তিপূজা শিরক। ফলে তার বিবেক তাকে সেই কাজ থেকে বিরত থাকতে বলবে। একজন খ্রিস্টান শূকরের মাংস ভক্ষণকে স্বাভাবিক মনে করতে পারেন। কিন্তু একজন মুসলমানের বিবেক তাকে তা গ্রহণ করতে বাধা দেয়, কারণ তার ধর্মীয় জ্ঞান অনুযায়ী তা হারাম। এই উদাহরণগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে বিবেক কোনো সর্বজনীন ও অভিন্ন আদালত নয়। বরং বিবেক তার মালিকের জ্ঞান ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। কুরআনের দৃষ্টিতে জ্ঞান ও বিবেক কুরআন মানুষকে বারবার জ্ঞান অর্জনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। আল্লাহ বলেন “বল, যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান?” (সূরা আয-যুমার ৩৯:৯) আবার তিনি বলেন: “যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।” (সূরা আল-ইসরা ১৭:৩৬) এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে সঠিক জ্ঞান ছাড়া সঠিক সিদ্ধান্ত সম্ভব নয়। মানুষ যদি অজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে জীবন পরিচালনা করে, তবে তার বিবেকও তাকে সঠিকভাবে পথ দেখাতে পারবে না। কুরআনে আরও বলা হয়েছে: “আমি তাকে দুই পথ দেখিয়ে দিয়েছি।” (সূরা আল-বালাদ ৯০:১০) অর্থাৎ মানুষকে সঠিক ও ভুল উভয় পথ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই পথের মধ্যে সঠিকটিকে বেছে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, চিন্তা ও হেদায়েত। বিবেকের সীমাবদ্ধতা ইতিহাসে অসংখ্য মানুষ এমন কাজ করেছে যা তারা নিজেদের কাছে সঠিক মনে করত, অথচ বাস্তবে তা ছিল ভয়াবহ অন্যায়। ধর্মীয় নিপীড়ন, বর্ণবাদ, দাসপ্রথা কিংবা গণহত্যার মতো অপরাধ বহু মানুষ তাদের নিজস্ব বিবেকের সমর্থন নিয়েই করেছে। কুরআন এই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে বলে “তারা মনে করে যে তারা ভালো কাজ করছে, অথচ তারা পথভ্রষ্ট। (সূরা আল-কাহফ ১৮:১০৪) এখানেই বিবেকের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যদি মানুষের জ্ঞান ভুল হয়, তবে বিবেকও ভুল সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে মনে করাতে পারে। কখন বিবেক শ্রেষ্ঠ আদালত হতে পারে? বিবেক তখনই মানুষের শ্রেষ্ঠ আদালত হতে পারে, যখন তা সত্যভিত্তিক জ্ঞান, শুদ্ধ বিশ্বাস এবং নৈতিক পরিশুদ্ধতার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। যখন মানুষ সত্য অনুসন্ধান করে, কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়, নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং মানবকল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করে, তখন তার বিবেক নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে। তখন বিবেক শুধু আবেগের প্রতিক্রিয়া নয়; বরং সত্য ও ন্যায়ের প্রতিধ্বনি হয়ে দাঁড়ায়। অতএব, বিবেককে অনুসরণ করার আগে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে আমাদের জ্ঞান সঠিক, আমাদের বিশ্বাস সত্যভিত্তিক এবং আমাদের চিন্তা পক্ষপাতমুক্ত। বিবেক সত্যের উৎস নয়; বিবেক হলো জ্ঞানের আত্মদর্শন। মানুষের অর্জিত জ্ঞান, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রতিফলনই হলো বিবেক। তাই জ্ঞান যদি শুদ্ধ হয়, বিবেকও শুদ্ধ হবে; জ্ঞান যদি বিকৃত হয়, বিবেকও বিভ্রান্ত হবে। সুতরাং, “বিবেকই শ্রেষ্ঠ আদালত” — এই কথাটি নিঃশর্তভাবে সত্য নয়। বরং বলা উচিত “সত্যভিত্তিক জ্ঞান দ্বারা আলোকিত বিবেকই মানুষের শ্রেষ্ঠ আদালত। কারণ জ্ঞান যেমন, বিবেকের রায়ও তেমন। আর সেই কারণেই মানবজীবনের প্রথম কর্তব্য হলো সত্যের সন্ধান, জ্ঞানের পরিশুদ্ধি এবং ন্যায়ের প্রতি আত্মসমর্পণ।

(লেখক: সানাউল্লাহ নুরী)