জানা নিউজ

বিচার বিভাগে আর্থিক দুর্নীতির চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি বেশি ক্ষতিকর: আইনমন্ত্রী

বিচার বিভাগে আর্থিক দুর্নীতির চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি দেশের বেশি ক্ষতি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, বিচারিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। অন্যদিকে, মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সব আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

রোববার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ের হোটেল হলিডে ইনে ‘বিচারিক কার্যক্রমে শুদ্ধাচার’ শীর্ষক এক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন তিনি। কর্মশালাটির আয়োজন করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

বিচার বিভাগের দুর্নীতি ও জবাবদিহির প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, আর্থিক দুর্নীতির পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিচার বিভাগের আর্থিক দুর্নীতি যতটা ক্ষতি করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করেছে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি। বিচারকদের মেধা, যোগ্যতা ও সততার স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি বিচারিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, যেসব বিচারকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বিষয়ে সরকার ও প্রধান বিচারপতি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের চেষ্টা করছেন। বিচার বিভাগের সততা ও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠায় কোনো ধরনের আপস করা হবে না।

বিচার বিভাগের অতীতের কিছু সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে আসাদুজ্জামান বলেন, বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও সীমা অতিক্রম করা হয়েছে। বিশেষ করে থার্টিন অ্যামেন্ডমেন্ট বা ত্রয়োদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত রায়ের মতো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

তাঁর অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টের কিছু সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দেশকে ফ্যাসিবাদের দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখা হয়েছিল। এসব সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু আর্থিক দুর্নীতির বিষয় ছিল না, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিও কাজ করেছে বলে মনে করেন তিনি।

আইনমন্ত্রী বলেন, বিচারিক পর্যালোচনার নামে অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগের ঘটনাগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। সংবিধান সংশোধন নিয়ে আলোচনার সময় আইনজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষ থেকেও বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষমতা পুনর্বিবেচনার দাবি এসেছে।

অতীতে গুমের ঘটনায় বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গুমের স্বীকার হওয়ার সময় বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁর সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি। গুমের ঘটনায় বিচারিক পর্যালোচনার মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সাংবিধানিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাধীন। একজন বিচারক সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী বিচারক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর তাঁর বিচারিক কাজে সরকারের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নেই। অধস্তন আদালতের বিচারকেরাও নিজ নিজ মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি বলেন, বিচারিক কাজে সরকারের হস্তক্ষেপ করার কোনো ইচ্ছা নেই। বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।

বিচারকদের পেশাগত মর্যাদার বিষয়েও কথা বলেন আইনমন্ত্রী। তাঁর মতে, বিচারকদের নিজেদের মধ্যে সচিবদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি করা উচিত নয়। স্বতন্ত্র পেশাগত অবস্থান ও মর্যাদা বজায় রেখেই তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

এ সময় বিচার বিভাগের ইতিবাচক দিকগুলোও সামনে আনার আহ্বান জানান তিনি। বলেন, অনেক বিচারক দিনরাত পরিশ্রম করে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু তাঁদের অবদান যথাযথভাবে আলোচনায় আসে না। বিচার বিভাগের নেতিবাচক দিক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সৎ ও নিষ্ঠাবান বিচারকদের কাজও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা প্রয়োজন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও গণহত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যেমন কথা বলতে হবে, তেমনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হতে হবে।

তিনি বলেন, একাত্তরের সংগ্রামে শহীদ জাফর, জয়নায়াল, দীপালি সাহা, কাঞ্চন, রাফুন, বসুনিয়া, জিহাদ ও ডাক্তার মিলনের মতো ব্যক্তিদের হত্যার বিষয়েও কথা বলা প্রয়োজন। একইভাবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আবু সাঈদ, মুগ্ধ ও আনাসসহ এক হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। এসব ঘটনায় দায়ীদের বিচারের দাবিতে কথা বলার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

আইনমন্ত্রীর অভিযোগ, সমাজকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বিভক্ত করা হয়েছে। বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এত মানুষের মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের ঘটনা নিয়ে নীরব রয়েছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁদেরও সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।

অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বন্দিবিনিময় বা প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ভারতের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তাঁকে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সব আইনি পদক্ষেপ নেবে সরকার।

ভারতে শেখ হাসিনাকে বন্দি হিসেবে বিবেচনা না করে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে দেখা হচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের কাছে শেখ হাসিনা একজন অপরাধী। দেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রকাশ্য আদালতে বিচার শেষে তিনি সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, “আমার কাছে উনি অপরাধী। আমাদের ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত একজন অপরাধী। এটাই হলো আমাদের কাছে তাঁর পরিচয়।”

তিনি আরও বলেন, “আমার রাষ্ট্রের কাছে ওপেন আদালতে বিচার হয়েছে। আপনারা যখন এই প্রশ্নটা করছেন, তাহলে তার আগে চিন্তা করেন, ১৪০০ মানুষ কি মারা যায়নি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে? ৩০ হাজার মানুষ কি পঙ্গু হয়নি? ন্যায়বিচারে কোনো রকম ঘাটতি রাখা হয়েছে? বিচার প্রক্রিয়ায় কি আমড়া ক্যামেরা ট্রায়াল করেছি? সাক্ষী কি সাক্ষ্য দেয়নি?”

শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আইনগতভাবে যা যা করণীয়, সরকার যথাযথ প্রক্রিয়ায় তা করছে। এ ক্ষেত্রে আবেগের কোনো বিষয় নেই, আইনের যথাযথ প্রয়োগই সরকারের লক্ষ্য।

তিনি বলেন, ভারত সরকারের কাছে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় অনুরোধ জানানো হয়েছে। ভারত তাঁকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে ভারত সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে সরকারের নতুন কোনো উদ্যোগ রয়েছে কি না, জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, এ-সংক্রান্ত সব উদ্যোগ ইতোমধ্যে চলমান রয়েছে।

অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় অধস্তন আদালতের বিচারক আরিফুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করার পর তাঁর বিরুদ্ধে আরও কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় রয়েছে। প্রক্রিয়া শেষ হলে হয় তাঁর বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হবে, নয়তো অপরাধের পরিণতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার করা রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায় নিয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশার বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ন্যায়বিচার চায়। আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণে গণহত্যার বিষয়টি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিচার হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, আগামী ১৯ নভেম্বর রোহিঙ্গা গণহত্যা-সংক্রান্ত মামলার রায়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশা ন্যায়বিচার।

কর্মশালায় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব বন্ধের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের সুফল পেতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।

তাঁর মতে, দলীয়, রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে বিচারকদের সততা ও বিচারিক অখণ্ডতা বজায় রাখা জরুরি। বিচারকেরা স্বাধীনভাবে ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেই সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।

বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠায় টিআইবির কার্যক্রমের প্রশংসা করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, নিরপেক্ষতা, নির্লোভ মনোভাব ও নিরন্তর প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে। বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় টিআইবির কার্যক্রম আরও গতিশীল হওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয় বা সরকারের সহযোগিতার প্রয়োজন হলে বাস্তবতা বিবেচনায় তা দেওয়া হবে।

মানবাধিকার কমিশন গঠন এবং সংবিধান সংশোধন নিয়ে টিআইবির দেওয়া সুপারিশ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, সব সুপারিশ শতভাগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে অনেক সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।