জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেওয়ার পর গত শনিবার রাজধানী প্যারিসের বিভিন্ন দোকানে ব্যাপক লুটপাট চালিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। দোকানের কাচ ভেঙে পণ্যসামগ্রী লুট করা হলেও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাদের বাধা দেওয়ার কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। প্যারিস থেকে এএফপি জানায়, কালো হুডি পরা মুখোশধারী লোকজন দল বেঁধে দোকানের ধাতব শাটার টেনে ভেঙে ভেতরে ঢোকে। এরপর তারা দোকানের তাক থেকে সিগারেট, সানগ্লাস, পোশাক, গয়না ও খাবারসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে যায়। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ছয় মাস আগে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শনিবার দেশজুড়ে লাখ লাখ মানুষ সমাবেশে যোগ দেন। এএফপির সাংবাদিকেরা একটি সুপারমার্কেট থেকে কেক, ফলের রস ও মদভর্তি ব্যাগ নিয়ে লুটকারীদের বেরিয়ে আসতে দেখেছেন। রাস্তার অপর পাশে একটি ছোট গয়নার দোকান থেকে তারা প্রাচীন ঘড়ি নিয়ে যায়। রাস্তার মোড়ে সানগ্লাসের সাজানো পুরো স্ট্যান্ডই উধাও হয়ে যায়। দোকানের ভেতরে ঢুকে লুটকারীরা নগদ অর্থ রাখার ক্যাশ রেজিস্টার খুঁজতে থাকে। সেগুলো মেঝেতে আছড়ে ভাঙলেও কখনো কখনো দেখা যায়, ভেতরে কোনো টাকাই নেই। রাস্তার পাশের একটি ক্যাফের খোলা বসার জায়গায় সহকর্মীর সঙ্গে বসে থাকা ৩৮ বছর বয়সী এক শিল্পশিক্ষক, যিনি নিজের নাম আলমা বলে জানিয়েছেন, বলেন, ‘আমি এর আগে কখনো এমন কিছু দেখিনি।’ দিনের শুরুতে ফরাসি প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন এলিসি প্রাসাদ অভিমুখে একটি ব্যর্থ মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন তারা দুজন। তবে এমন পরিস্থিতির মধ্যেও তারা বলেন, বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভের কারণ তারা ‘বুঝতে পারেন’। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে আয়োজিত মিছিলগুলোতে ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। এসব মিছিলের পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে সহিংসতা শুরু হয়। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিটি জানিয়েছে, এতে ৮ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারেন এবং আতশবাজি নিক্ষেপ করেন। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
‘গভীর ক্ষোভ’
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু শনিবার রাতে ‘অত্যন্ত তীব্র সহিংসতার’ নিন্দা জানিয়ে বলেন, এ ঘটনায় ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার বলেন, রাজধানীর পুরো পুরো সড়ক ‘বিধ্বস্ত’ হয়ে গেছে। তবে তিনি প্রতিবাদ জানানোর ‘মৌলিক’ অধিকার এবং ‘অগ্রহণযোগ্য’ সহিংসতার মধ্যে পার্থক্য করেন। আলমা বলেন, ‘মানুষ কেন ক্ষুব্ধ হতে পারে, তা আমি বুঝতে পারি। তবে আমার মনে হয়, কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত না করা পর্যন্ত সম্পত্তির ক্ষতি করাটা ঠিক আছে।’
রেস্তোরাঁ, হোটেল ও আবাসিক ভবনগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হামলা থেকে রক্ষা পেয়েছে। ফলে বাইরে যখন ভাঙচুর ও লুটপাট চলছিল, তখন প্যারিসের বাসিন্দাদের অনেকে বন্ধুদের সঙ্গে শনিবারের নিয়মিত মধ্যাহ্নভোজ উপভোগ করছিলেন-যা এক অদ্ভুত দৃশ্যের সৃষ্টি করে। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের অ্যাপার্টমেন্টের নিরাপদ জায়গা থেকে সহিংসতার দৃশ্য দেখেন। ২৯ বছর বয়সী সরকারি কর্মকর্তা জুলস বলেন, ‘কী একটা দৃশ্য!’ তিনি বলেন, ‘তাদের মধ্যে নিশ্চয়ই গভীর ক্ষোভ রয়েছে। তারা সমাজের এমন একটি অংশ, যারা নিজেদের সমাজের সঙ্গে একীভূত বলে মনে করে না।’ বিক্ষোভের অধিকারকে সমর্থন করলেও লুটপাটকারীরা নিজেদের লক্ষ্যকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছেন বলে মনে করেন তিনি। তিনি এএফপিকে বলেন, ‘রাস্তাটির অবস্থা একবার দেখুন।’ প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে বিখ্যাত প্লাস দ্য লা রিপাবলিক চত্বরের কাছে সড়কজুড়ে ভাঙা কাচ ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিল। সেখানে একগাদা জ্বলন্ত সাইকেল থেকে ঘন ধোঁয়া বের হচ্ছিল। এলাকাটিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দেখা যায়নি। দিনের শুরুতে সেখানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছিল।