জানা নিউজ

পারমাণবিক হুমকিতে নতি স্বীকার করবে না দিল্লি

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রথম কমিটির বৈঠকে পাকিস্তানের বক্তব্যের জবাবে কঠোর অবস্থান জানিয়েছে ভারত। দেশটির কূটনীতিক অনমল শের সিং বেদি বলেছেন, সন্ত্রাসী হামলার জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে পারমাণবিক হুমকির কাছে নতি স্বীকার করবে না নয়াদিল্লি।

ভারতের বিরুদ্ধে যেকোনো সন্ত্রাসী হামলার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। 

ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

 

জাতিসংঘে ভারতের ফার্স্ট সেক্রেটারি অনমল শের সিং বেদি ‘রাইট অব রিপ্লাই’ বা জবাব দেওয়ার অধিকার প্রয়োগ করে পাকিস্তানের বক্তব্যের জবাব দেন। এ সময় তিনি সন্ত্রাসবাদ, জম্মু ও কাশ্মীর, সিন্ধু নদের পানিবণ্টন চুক্তি এবং পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার নিয়ে ভারতের অবস্থান তুলে ধরেন।

 

বেদি বলেন, ভারত সংঘাত চায় না। তবে বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা না হলে শান্তি কেবল এক সংকট থেকে আরেক সংকটের মধ্যবর্তী বিরতিতে পরিণত হবে।

 

জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে ২৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে ভারতীয় এই কূটনীতিক বলেন, ওই হামলার জবাবে গত বছরের মে মাসে ভারতের সামরিক পদক্ষেপ ছিল আত্মরক্ষার অংশ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পদক্ষেপগুলো ছিল সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ও পরিমিত। এর উদ্দেশ্য ছিল সন্ত্রাসী হুমকি মোকাবিলা করা, বৃহত্তর যুদ্ধ শুরু করা নয়।

বেদি বলেন, সন্ত্রাসী হামলার জবাব দেওয়া ভারতের আত্মরক্ষার অধিকারের মধ্যে পড়ে। পারমাণবিক সংঘাতের আশঙ্কা দেখিয়ে সেই অধিকার সীমিত করার প্রচেষ্টা ভারত মেনে নেবে না।

তিনি অভিযোগ করেন, পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিণতি এড়ানোর চেষ্টা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর মতে, এ ধরনের কৌশল সংঘাত কমানোর পরিবর্তে পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।

ভারতের অবস্থানের তিনটি মূলনীতি তুলে ধরে বেদি বলেন, দেশটির বিরুদ্ধে যেকোনো সন্ত্রাসী হামলার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে, পারমাণবিক হুমকির কাছে নতি স্বীকার করা হবে না এবং সন্ত্রাসবাদে মদদদাতা ও হামলার পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হবে না।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত সিন্ধু নদের পানিবণ্টন চুক্তি নিয়েও কথা বলেন বেদি। বিশ্বব্যাংকের সম্পৃক্ততায় সম্পাদিত চুক্তিটি পারস্পরিক আস্থা ও সদিচ্ছার ভিত্তিতে স্বাক্ষরিত হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বেদির বক্তব্য, কোনো রাষ্ট্র চুক্তির ভিত্তি হিসেবে থাকা আস্থা ও সহযোগিতা দুর্বল করে একই সঙ্গে সেই চুক্তি থেকে পাওয়া সুবিধা অক্ষুণ্ন রাখার দাবি করতে পারে না। এ প্রসঙ্গে তিনি দুই দেশের পারস্পরিক দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিষয়টি তুলে ধরেন।

পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার প্রসঙ্গে পাকিস্তানি বিজ্ঞানী এ কিউ খানের নেটওয়ার্কের ইতিহাস উল্লেখ করেন ভারতীয় এই কূটনীতিক। ওই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের পারমাণবিক কর্মসূচিতে প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ সহায়তা পৌঁছানোর বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল।

বেদি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৫৪০ নম্বর প্রস্তাবের কথাও উল্লেখ করেন। ২০০৪ সালে গৃহীত এই প্রস্তাবে গণবিধ্বংসী অস্ত্র ও এ-সংক্রান্ত উপকরণ অরাষ্ট্রীয় পক্ষের হাতে যাওয়া ঠেকাতে রাষ্ট্রগুলোকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, পারমাণবিক প্রযুক্তির বিস্তার রোধে সব রাষ্ট্র ও দায়িত্বশীল সরবরাহকারীর সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। এটি শুধু ভারতের নিরাপত্তার জন্য নয়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেও জরুরি।

পারমাণবিক সহযোগিতা ও উন্নত সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও যথাযথ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান তিনি।

জম্মু ও কাশ্মীর প্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বেদি অঞ্চলটিকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ভারতের ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের অবৈধ দখলে থাকা ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বেদি বলেন, ভারত সব সময় শান্তির পক্ষে এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। তবে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সন্ত্রাসবাদ ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ডের দায় নির্ধারণ করা জরুরি।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সন্ত্রাসবাদ, কাশ্মীর এবং নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা রয়েছে। পেহেলগামের হামলার পর দুই দেশের বিরোধ আরও তীব্র হয়। এ পরিস্থিতিতে পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।