মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে নির্ধারিত আলোচনার শর্তগুলো নিয়ে কথা বলতে ইরানি সরকারের একটি প্রতিনিধি দল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। অন্যাদিকে, এই আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে রয়েছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে প্রথম দফার আলোচনা যখন শুরু হওয়ার পথে, তখন ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের সাথে বৈঠকের শেষ পর্যায়ে ইরানি পক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে তারা আমেরিকানদের সঙ্গে মূল আলোচনায় বসবে কি না। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির। ইরান এর আগে বলেছিল, স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের যেকোনো চুক্তিতে অবশ্যই নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করতে হবে এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হবে। তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, লেবানন ইস্যুটি ইসলামাবাদে আলোচনার টেবিলে আসবে না। উভয় পক্ষই আলোচনার ভেন্যুতে পৌঁছেছে। এর আগে সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বে ইরানি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শেহবাজ শরীফের সাথে সাক্ষাৎ করেন। গত রাতে তারা রাজধানীর অদূরে একটি বিমান ঘাঁটিতে অবতরণ করেন, সেখানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির তাদের স্বাগত জানান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক থাকা জেনারেল আসিম মুনির নুর খান বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকেও স্বাগত জানান। সেখানে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন। বিবদমান দুই পক্ষ এখনও নিষেধাজ্ঞা, লেবানন এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার মতো মূল ইস্যুগুলোতে বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে এবং তারা একে অপরের প্রতি পারস্পরিক সন্দেহ লুকানোর কোনো চেষ্টাই করছে না। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অবতরণের পরপরই গালিবাফ বলেন, ‘আমেরিকানদের সঙ্গে আলোচনার আমাদের অভিজ্ঞতা সবসময় ব্যর্থতা এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।’ অন্যদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শনিবার তার জার্মান প্রতিপক্ষের সাথে ফোনালাপে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বারবার প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন ও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ইরান পূর্ণ অবিশ্বাস নিয়ে আলোচনায় অংশ নিচ্ছে।’ এর আগে, জেডি ভ্যান্স যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগের আগে বলেছিলেন, অন্য পক্ষ যদি ‘সদিচ্ছা নিয়ে আলোচনা করতে চায়, তবে আমরা অবশ্যই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত।’ তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আরও যোগ করেন, ‘তারা যদি আমাদের সাথে চাতুরি করার চেষ্টা করে, তবে এই আলোচনার প্রতিনিধি দল খুব একটা নমনীয় হবে না।’
অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই
বর্তমান যুদ্ধবিরতি ইতোমধ্যেই চাপের মুখে রয়েছে, বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার কারণে। ইরান ও পাকিস্তান জোর দিয়ে বলছে যে, লেবাননও বর্তমান এই যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ, যার দেশের শেষ মুহূর্তের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষ এই সপ্তাহে আলোচনার টেবিলে বসেছে, তিনিও স্বীকার করেছেন যে আলোচনা সহজ হবে না। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এবং পরবর্তীতে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি পাল্টা হামলার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের প্রচেষ্টা প্রসঙ্গে শেহবাজ শরীফ বলেন, ‘সামনে আরও কঠিন পর্যায় অপেক্ষা করছে। এটি এমন একটি পর্যায় যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘মেক অর ব্রেক’ (হয় সফল হবে, নয়তো সব শেষ হয়ে যাবে)।’
আলোচনার আয়োজক ইসলামাবাদ
ইরান তাদের ৭০ জনেরও বেশি সদস্যের একটি বিশাল প্রতিনিধি দল পাকিস্তানে নিয়ে এসেছে। তারা শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রেও কার্যকর হতে হবে এবং তাদের জব্দকৃত সম্পদ অবমুক্ত করতে হবে। যদিও এখন পর্যন্ত এর কোনোটিই কার্যকর হয়নি। মার্কিন পক্ষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতির পূর্বশর্ত হিসেবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। তবে এটি এখনো স্বাভাবিক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার ঘোষণা করেন, ইরানের সহযোগিতা থাক বা না থাক, তিনি খুব শিগগিরই এটি উন্মুক্ত করবেন। তিনি আরও যোগ করেন, এই আলোচনার তার প্রধান লক্ষ্য হলো ইরান যেন পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না পারে এবং এটাই আলোচনার ৯৯ শতাংশ। গতকাল শনিবার পাকিস্তানের রাজধানীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত জোরদার। শহরের রাস্তায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি ও কূটনৈতিক ভবন সংলগ্ন ‘রেড জোন’ এলাকায় চলাচলের পথ পরিবর্তন করা হয়েছে। একটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে এএফপি জানিয়েছে, নেভিগেশন (জাহাজ চলাচল), পারমাণবিক এবং অন্যান্য মূল বিষয়ে আলোচনার সুবিধার্থে পাকিস্তান বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল গঠন করেছে। এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। মিশর, তুরস্ক এবং চীন মধ্যস্থতায় সহায়তা করেছে এবং পাকিস্তান এখনও তাদের সাথে নিবিড়ভাবে সমন্বয় চালিয়ে যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, কোনো স্থায়ী চুক্তির ক্ষেত্রে চীন সম্ভাব্য ‘গ্যারান্টর’ বা জামিনদার হতে পারে। ট্রাম্প নিজেই এএফপি-র কাছে নিশ্চিত করেছেন যে, তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে চীন সহায়তা করেছে।
লেবাননে সংঘাত
স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরায়েলের দাবি করা প্রসঙ্গটি, তা হলো বর্তমান যুদ্ধবিরতি লেবাননের জন্য প্রযোজ্য নয়। ইরানের হামলা বন্ধের দাবি সত্ত্বেও শুক্রবারও লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি বিমান হামলা অব্যাহত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লাইটার জানিয়েছেন, তার দেশ আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে লেবানন সরকারের সাথে আলোচনা করবে, তবে হিজবুল্লাহর সঙ্গে কোনো যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করবে না। হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা উত্তর ইসরায়েল এবং দক্ষিণ লেবাননে অবস্থানরত ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর ড্রোন ও রকেট হামলা চালিয়েছে। তেহরানে ৩০ বছর বয়সী এক বাসিন্দা এএফপি-কে বলেন, তিনি এই আলোচনার সাফল্য নিয়ে সন্দিহান। তার মতে, ট্রাম্প যা বলেন তার বেশিরভাগই হলো ‘নিছক চিৎকার এবং আজেবাজে কথা।’