দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গু সংক্রমণ। এবার দেশের ঙেঙ্গু পরিস্থিতি গতবছরের চেয়েও খারাপ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যমান এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। বর্তমানে ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে। গত দুই বছর ধরে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব নিয়মিত নজরদারি না হওয়ায় ওয়ার্ডভিত্তিক প্রকৃত পরিস্থিতির সঠিক তথ্য নেই। আর কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে না মশা নিয়ন্ত্রণের কাজও। চলতি বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। এখনই বাড়ি বাড়ি এডিস মশার লার্ভা অনুসন্ধান, প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত লার্ভিসাইড প্রয়োগ এবং পর্যাপ্ত কীটনাশক সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জুন মাসের প্রথমদিনেই হাসপাতালে ১০১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং একজন প্রাণ হারায়। আর চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৩৮৪ জন ডেঙ্গু আক্রান— হয়েছে এবং ৬ জন মারা গেছে। বর্তমানে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও এখনো কাটেনি ডেঙ্গু প্রতিরোধ ব্যবস্থার পুরোনো দুর্বলতা। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে এডিস মশার জাতীয় জরিপ না হওয়া, সিটি করপোরেশনগুলোতে কীটতত্ত্ববিদের সংকট এবং মাঠপর্যায়ের নজরদারির অভাব পরিস্থিতিকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। প্রতি বছর সাধারণত বর্ষার আগে, বর্ষাকালে ও বর্ষার পরে তিন দফায় এই জরিপ করার কথা। আর ওই জরিপের মাধ্যমে কোন এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব কত, কোথায় ঝুঁকি বেশি ও কোন এলাকায় আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিতে হবে তা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে কার্যত কোনো জাতীয় জরিপ হয়নি। ফলে কোথায় বেড়েছে মশার বিস্তার বাড়ছে, কোন এলাকা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম।
সূত্র জানায়, সরকার ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশজুড়ে চিরুনি অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং চিকিৎসার বিশেষ প্রটোকলসহ বিভিন্ন প্রস্তুি নিয়েছে। পরিত্যক্ত ওয়াশরুম, ছাদ ও গ্যারেজে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা ধ্বংসে বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহারের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ওই লক্ষ্যে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলো ডেঙ্গুরোগীদের জন্য মোট সিটের ১০ শতাংশ ছাড় দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওসব সিটের রোগীদের কোনো ডাক্তার বা বেড চার্জ দিতে হবে না (শুধু ওষুধ ও খাবারের খরচ রোগী বহন করবে)। তাছাড়া ডেঙ্গু রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষায়ও ৮০ শতাংশ ছাড় দেয়া হবে। যদিও এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় চলতি বছর কম। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে এবং মে মাসে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে মার্চ ও এপ্রিলে ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। আর গত ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছিল। ওই মাসে ১০৪ জনের প্রাণহানি ঘটে।
এদিকে এডিস মশার লার্ভা শনাক্তের জরিপ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ জানান, আগে সিডিসি ওই জরিপ করলেও বর্তমানে তার দায়িত্বে রয়েছে আইইডিসিআর।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. আহমেদ নওশের আলম জানান, বর্তমানে কোনো জরিপ পরিচালিত হচ্ছে না।
ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চিকিৎসা প্রস্তুতি বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের এক সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুই মাস আগে থেকেই সিটি করপোরেশনগুলোর সঙ্গে সমন্বিত কার্যক্রম শুরু করেছে। ডেঙ্গু শুধু স্বাস্থ্য খাতের বিষয় নয়। এটি জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই মশার উৎস নির্মূলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একযোগে কাজ করতে হবে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর বিষয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।