ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির তেরঙা মিছিল ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দিল্লির কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে জাতীয় পতাকা হাতে প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন দলটির নেতা অভিজিৎ দিপকে। তবে কর্মসূচি বন্ধে জরুরি অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেননি সুপ্রিম কোর্ট।
অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বড় জমায়েতের পরিবর্তে ১১ জনের একটি দলকে জাতীয় পতাকা নিয়ে অবস্থান ও জাতীয় সংগীত গাওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে দিল্লি পুলিশ।
শুক্রবার এ-সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ সব পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। আদালত বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি উৎসবের মৌসুমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছে ককরোচ জনতা পার্টি। গত ১৩ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে জাতীয় পতাকা হাতে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে দলটির দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা গ্রেফতার হন। পুলিশি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সেখানে প্রবেশ এবং সংশ্লিষ্ট শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়। তারা বর্তমানে তিহার জেলে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই নেতার গ্রেফতারের প্রতিবাদে শুক্রবার কনট প্লেসে তেরঙা মিছিলের ডাক দেন অভিজিৎ দিপকে। তার অভিযোগ, জাতীয় পতাকা ওড়ানোর কারণেই দলের দুই নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, তাদের আন্দোলনের কারণে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হচ্ছে না। বরং প্রতিবাদ ঠেকাতে প্রশাসন যখন শহরের বিভিন্ন এলাকায় কড়াকড়ি আরোপ করে, চলাচলে বাধা দেয় এবং ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখে, তখন সাধারণ মানুষের জীবিকা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ, ক্ষতির দাবি
দিল্লির ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা কনট প্লেসের ব্যবসায়ীদের একাংশ অবশ্য ভিন্ন উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, গত কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও পুলিশি বিধিনিষেধের কারণে ক্রেতাদের যাতায়াত কমেছে। উৎসবের মৌসুমে এমন পরিস্থিতি ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিক্ষোভের কারণে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করেছেন ব্যবসায়ীদের একাংশ। তবে এই ক্ষতির পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
এ পরিস্থিতিতে সেন্ট্রাল পার্ক ও আশপাশের এলাকায় রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের আবেদন জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন এক ব্যবসায়ী।
পালিকা বাজারের পোশাক ব্যবসায়ী অনিল কুমার গুপ্তা দিল্লি হাইকোর্টে করা আবেদনে অভিযোগ করেন, বিক্ষোভের কারণে সড়ক, ফুটপাত ও রাজীব চক মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে ক্রেতাদের চলাচল ব্যাহত হয়। এতে উৎসবের মৌসুমে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েন।
বৃহস্পতিবার এ আবেদনের শুনানিতে দিল্লি হাইকোর্ট সরাসরি বিক্ষোভ বন্ধের নির্দেশ দেননি। তবে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি পুলিশের ওপর ছেড়ে দেন।
১১ জনকে নিয়ে কর্মসূচির প্রস্তাব পুলিশের
দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার জানানো হয়, কনট প্লেস ও আশপাশের এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারার অধীনে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। শুক্রবার বড় জমায়েত এড়াতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বানও জানানো হয়।
একই সঙ্গে সেন্ট্রাল পার্কের উপযুক্ত স্থানে ১১ জনের একটি দলকে জাতীয় পতাকা নিয়ে অবস্থান এবং জাতীয় সংগীত গাওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব সামনে আসে। তবে এই প্রস্তাবকে পূর্ণাঙ্গ তেরঙা মিছিলের অনুমতি হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
এদিকে, শুক্রবারের কর্মসূচি ঘিরে দিল্লিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। কনট প্লেস, সেন্ট্রাল পার্ক ও নয়াদিল্লির বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েনের কথা জানা গেছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সদস্যের সংখ্যা ৩২ হাজার ছাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে এ সংখ্যার স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য পাওয়া যায়নি।
অহিংস আন্দোলনের কথা বলছে দলটি
অভিজিৎ দিপকে দাবি করেছেন, তার দল মহাত্মা গান্ধীর অহিংস ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের নীতিতে বিশ্বাসী। সংবিধান অনুযায়ী সরকারের কাছে জবাবদিহি চাওয়া এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানানো নাগরিকদের অধিকার বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
তার দাবি, মুম্বাই, পুনে, জয়পুর, লখনউ, বেঙ্গালুরু ও নাগপুরে তাঁদের দলের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট তাৎক্ষণিকভাবে কর্মসূচি বন্ধের নির্দেশ না দেওয়ায় দিল্লিতে প্রতিবাদের অধিকার, জনসাধারণের চলাচল এবং ব্যবসায়ীদের জীবিকা রক্ষার বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। শুক্রবারের কর্মসূচি ঘিরে দিল্লি পুলিশ কী ব্যবস্থা নেয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহল ও ব্যবসায়ীদের।