রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় কবর থেকে মানবদেহের কঙ্কাল উত্তোলন করে সংগ্রহ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্যাগ ও বস্তায় রাখা ৪৭টি মানব কঙ্কাল ও মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের হাড় জব্দ করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১০ মার্চ) ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ইবনে মিজান।গ্রেপ্তাররা হলেন— কাজী জহরুল ইসলাম ওরফে সৌমিক (২৫), মো. আবুল কালাম (৩৯), আসাদুল মুন্সী ওরফে জসিম ওরফে এরশাদ (৩২) এবং মো. ফয়সাল আহম্মেদ (২৬)। ডিসি মোহাম্মদ ইবনে মিজান জানান, গত ৯ মার্চ রাতে তেজগাঁও থানার অভিযানের প্রস্তুতিকালে পুলিশ জানতে পারে মনিপুরী পাড়ার একটি স্থানে অবৈধভাবে উত্তোলন করা ও প্রসেসড মানব কঙ্কাল বিক্রির চেষ্টা চলছে। পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে এক ব্যক্তির সন্দেহজনক আচরণ লক্ষ্য করে তাকে চ্যালেঞ্জ করলে তার কাছ থেকে একটি সম্পূর্ণ মানব কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে ওই ব্যক্তি জানান, তিনি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য এবং তার সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত। তিনি আরও জানান, তার সহযোগী দুই ব্যক্তি তেজগাঁও কলেজের সামনে মানব কঙ্কাল নিয়ে অবস্থান করছেন। পরে তাৎক্ষণিকভাবে আরেকটি দল সেখানে গিয়ে আরও দুজনকে আটক করে। তাদের মধ্যে কাজী জহরুল ইসলাম ওরফে সৌমিক সাপুরা ডেন্টাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের শিক্ষার্থী। অন্য দুজন হলেন আবুল কালাম ও আসাদুল মুন্সী। তাদের কাছ থেকেও দুটি মানব কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে তাদের থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে পুলিশ জানতে পারে, এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্র এবং তারা দীর্ঘদিন ধরে দেশজুড়ে এই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তারা স্বীকার করে, তাদের কাছে আরও অনেক কঙ্কাল রয়েছে। সেগুলো উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় সাপুরা ডেন্টাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের ক্যাম্পাস সংলগ্ন একটি স্থানে রাখা আছে।পরে পুলিশ সেখানে অভিযান চালিয়ে ক্যাম্পাসের হোস্টেলের ৪০২ নম্বর কক্ষ থেকে আরও ৪৪টি মানব কঙ্কাল উদ্ধার করে। কঙ্কালগুলো বিভিন্ন ব্যাগ ও বস্তায় ভরে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রাখা ছিল।
এভাবে মোট ৪৭টি কঙ্কাল জব্দ করা হয়। ডিসি ইবনে মিজান বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা জানিয়েছেন, এই চক্রের মূলহোতা ফয়সাল দীর্ঘদিন ধরে মানব কঙ্কাল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তারা অনলাইনে ‘বোন সেলিং’ নামে একটি গ্রুপ পরিচালনা করে, যেখানে প্রায় ৭০০ জন কর্মী কাজ করে এবং সদস্য সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার।তিনি আরও জানান, তেজগাঁও কলেজের সামনে আটক আবুল কালামের বিরুদ্ধে ২১টি মামলা রয়েছে। ২০০৯ সালে তার বিরুদ্ধে প্রথম মামলা হয় কবর থেকে কঙ্কাল চুরির অভিযোগে। এছাড়া কঙ্কাল চুরি, ডাকাতির প্রস্তুতি, মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। আসাদুল মুন্সীর বিরুদ্ধেও ডাকাতির প্রস্তুতি ও চুরির অভিযোগে দুটি মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তার দুই মেডিকেল শিক্ষার্থী জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন যে তারা মানব কঙ্কাল বিক্রির সঙ্গে জড়িত। তাদের মধ্যে কেউ ৫০টি, কেউ ২০ থেকে ২৫টি কঙ্কাল বিক্রি করেছেন বলেও জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে কঙ্কাল সংগ্রহে আরও অনেক ব্যক্তি জড়িত রয়েছে। মূলত গাজীপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও জামালপুর এলাকায় এই চক্রটি সক্রিয়।পুলিশ জানায়, চক্রটি কবর দেওয়ার প্রায় এক বছর পর সুযোগ বুঝে লাশ উত্তোলন করে। সাধারণত যেসব কবরস্থান অরক্ষিত, যেখানে পাহারাদার বা সিসিটিভি নেই এবং লোকজনের যাতায়াত কম; সেসব স্থানকে তারা টার্গেট করে। পরে এজেন্টদের মাধ্যমে কঙ্কাল সংগ্রহ করে কেমিক্যাল দিয়ে প্রসেস করে বিক্রির উপযোগী করা হয়। প্রাথমিকভাবে তারা প্রতি কঙ্কাল ৬ থেকে ৮ হাজার টাকায় কিনে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করত। তাদের অধিকাংশ ক্রেতাই মেডিকেল শিক্ষার্থী বলে জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তাদের আদালতে পাঠানো হবে বলে জানান ডিএমপির এই কর্মকর্তা।