আর্টিস্ট মতিউর রহমান কেবল একজন শিল্পীই ছিলেন না, শিল্পকলায় দীর্ঘ সময়ের সাক্ষীও ছিলেন।
প্রয়াত শিল্পী মতিউর রহমান স্মরনে
প্রতিভা কখনো আটকে থাকেনা কোন না কোন ভাবে প্রকাশিত হয়ে যায়। একজন সরকারি চাকুরিজীবী হয়েওে তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন চারু কলায়। বলছি সদ্য প্রয়াত শিল্পি মতিউর রহমানকে নিয়ে।
শিল্পী মতিউর রহমান ১৯৫০-এর দশকে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তৎকালীন চারুকলা ইনস্টিটিউট (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রেখা এবং অক্ষরের বিন্যাসের প্রতি বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন। তাঁর তুলির আঁচড়ে পুরান ঢাকাকে যেভাবে জীবন্ত করেছেন, তা সমকালীন শিল্পকলায় বিরল। লালবাগ কেল্লা, তারা মসজিদ এবং রূপলাল হাউজের মতো স্থাপনাগুলোকে তিনি ভিন্ন এক আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন।পুরান ঢাকার চিরচেনা রিকশা এবং সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবন ছিল তাঁর ছবির প্রাণ।
তার ছোটবেলা কেটেছে হবিগঞ্জ। হবিগঞ্জ জেলা স্কুলে পড়াশোনা করেছেন তারপর ঢাকার চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় (বর্তমান চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) তে ড্রয়িং ও পেইন্টিং ডিপার্টমেন্ট এ পড়াশোনা করেছেন।
কর্মজীবনে সরকারি চাকরি করেছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়ে। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সার শিল্পী হিসেবে প্রচুর তৈলচিত্র ও জলরং এর কাজ করেছেন।
একজন ভক্ত লিখেছেন “ বড় শিল্পীদের ভিড়ে কিংবা বর্তমান সেলিব্রিটি আর্টিস্টদের প্রভাবে – জানি না আপনার মত ভালো মনের একজন নির্ভতচারী শিল্পীর অবদান বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাস কখনো মনে রাখবে কিনা ! আপনারাই ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম দিকের আর্ট গ্যালারী শিল্প বিকাশের সহযোগী, সহযোদ্ধা শিল্পী । তবে কেউ স্বীকার করুক আর না করুক, আমাদের মত পুরানো যেসব আর্ট গ্যালারী এখনো শত কষ্ট, যন্ত্রনা বুকে চেপে, শিল্পকে ভালোবেসে টিকে আছে –
আপনাকে, আপনাদেরকে অস্বীকার করা, ভুলে যাওয়া- আপনার প্রতি গ্যালারী গুলোর জন্য অবিচার করা হবে ’’
তিনি পুরনো ঢাকাকে বিষয় হিসেবে প্রচুর কাজ করেছেন। জনবহুল পুরোনো ঢাকার মধ্যে তিনি শিল্পী জীবনের সার্থকতা দেখেছিলেন। এবং আজীবন পুরোনো ঢাকার অলি-গলি, চক, ছোটো কাটরা, বড়ো কাটরা, নবাবপুর, বংশাল, মাহূতটুলি, শাখারি পট্টি, বাবুবাজার, জিন্দাবাহার, সদরঘাট, ইত্যাদি এলাকার কর্মমুখর দৃশ্যকে তাঁর ক্যানভাসে এঁকেছেন।
এক সময় বাণিজ্যিকভাবে তার ছবির কদর ছিল ভীষণ, জনপ্রিয় ছিলো তাঁর পেইন্টিং। দেশের কমার্শিয়াল আর্ট গ্যালারিগুলোতে তাঁর ছবির প্রদর্শন ছিলো অনিবার্য। বর্তমানেও তাঁর শিল্পকর্মের দেখা মিলবে গুলশানের বাণিজ্যিক গ্যালারিগুলোতে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন (Bill Clinton) ২০০০ সালের মার্চে বাংলাদেশে সফর কালে, প্রেসিডেন্টের অগ্রবর্তী দলের প্রতিনিধিরা প্যান প্যাসিফিক হোটেল সোনারগাঁওয়ের ডিভাইন আর্ট গ্যালারি থেকে শিল্পী মতিউর রহমানের পেইন্টিং কিনে নেন। এবং বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি হিসেবে সেই শিল্পকর্মের ইমেজ টি-শার্টে প্রিন্ট করে তা প্রদর্শন করেন । ওই সময় এই ঘটনাটি ছিল টক অন দ্য টাউন। ন্যাশনাল নিউজ পেপার গুলিতে নিউজ হয়, ফলে ব্যাপক সাড়া পড়ে।
শিল্পী মতিউর রহমান ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ইং ভোরে তিনি ইন্তেকাল করেছেন।( ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না লিল্লাহি রাজিউন)। তিনি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের (বর্তমান চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) ১৯৭৩ সনের ব্যাচের ছাত্র ছিলেন।
তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানাই।
শিল্পী মতিউর রহমান অত্যন্ত সৎ অমায়িক, সাদাসিধে মানুষ ছিলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁকে জান্নাত নসীব করুন।