জানা নিউজ

৪৫ লাখ মামলা থেকে ২৫ লাখ কমানোর লক্ষ্য সরকারের: আইনমন্ত্রী

দেশে বিচারাধীন প্রায় ৪৫ লাখ মামলা থেকে এক বছরে অন্তত ২৫ লাখ কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম জোরদার করছে সরকার। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, আদালতে মামলা দায়েরের আগেই বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ থাকায় এ উদ্যোগ ইতোমধ্যে আশাব্যঞ্জক ফল দিচ্ছে। পাইলট প্রকল্পে মামলা দায়েরের হার গড়ে ৬২ দশমিক ০২ শতাংশ কমেছে বলেও জানান তিনি।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ঢাকায় আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষ থেকে ভার্চুয়ালি ১০ জেলায় মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী।

আইনমন্ত্রী বলেন, দেশে বিপুলসংখ্যক মামলা বিচারাধীন থাকায় বিচারব্যবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি হয়েছে। আদালতে মামলা করার আগেই আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি করা গেলে বিচারপ্রার্থীর সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমবে। একই সঙ্গে আদালতে নতুন মামলার চাপও কমানো সম্ভব হবে।

তিনি জানান, ২০ জেলায় পাইলট প্রকল্পের আওতায় প্রি-কেস মেডিয়েশন চালুর পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে বিভিন্ন আইনে মামলা দায়ের উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

এর মধ্যে পারিবারিক আদালত আইনে মামলা ৩ হাজার ৫৫৯টি থেকে কমে ১ হাজার ৭৪৪টিতে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ৫১ শতাংশ হ্রাস। সম্পত্তি বণ্টন সংক্রান্ত মামলায় ২ হাজার ১টি থেকে কমে ৬৬১টি হয়েছে, কমেছে ৬৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি আইনের প্রিম্পশন মামলায় ১৭টি থেকে কমে ২টি, নন-এগ্রিকালচারাল টেন্যান্সি আইনের মামলা ৩১টি থেকে ১৪টি, যৌতুক নিরোধ আইনের মামলা ৫ হাজার ৬০৫টি থেকে ১ হাজার ৮১০টি এবং পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইনের মামলা ৪৩টি থেকে ৩৫টিতে নেমেছে। সব মিলিয়ে মামলা দায়েরের হার গড়ে ৬২ দশমিক ০২ শতাংশ কমেছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, “আদালতে মামলা দায়েরের প্রবাহ এভাবে কমানো গেলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।”

তিনি জানান, বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতার প্রক্রিয়ায় এক বছরে মামলার সংখ্যা ২৫ লাখে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে সরকার। বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে যেগুলো আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তিযোগ্য, সেগুলো জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে মধ্যস্থতার জন্য পাঠাতে বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

আইনমন্ত্রী বলেন, আদালত, জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করলে আগামী এক বছরের মধ্যে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে।

মধ্যস্থতা কার্যক্রমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথাও জানান তিনি। এ বিষয়ে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। মধ্যস্থতাকারীদের এই দায়িত্বকে শুধু চাকরি হিসেবে না দেখে জনসেবামূলক দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানান তিনি।

কক্সবাজারে এক লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে উল্লেখ করে জেলা জজ, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের আগামী তিন মাসে মামলাজট দৃশ্যমানভাবে কমানোর উদ্যোগ নিতে বলেন আইনমন্ত্রী। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

এদিন ১০ জেলায় একযোগে মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম চালু করা হয়। জেলাগুলো হলো বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল।

আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ধারা ২১খ অনুযায়ী এসব জেলায় সাত ধরনের বিরোধের ক্ষেত্রে আদালতে মামলা দায়েরের আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিতে হবে। এর আওতায় রয়েছে পারিবারিক বিরোধ, বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ, সম্পত্তি বণ্টন, সরকারি জমি ক্রয় সংক্রান্ত বিরোধ, অকৃষি জমি সংক্রান্ত বিরোধ, পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ এবং যৌতুক সংক্রান্ত অভিযোগ।

আইনমন্ত্রী বলেন, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে পরিচালিত মধ্যস্থতা কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত এ কার্যক্রমের মাধ্যমে অসহায় ও প্রান্তিক মানুষ বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা ও দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ পাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

প্রি-কেস মেডিয়েশন কার্যক্রম বাস্তবায়নে জাইকা, জিআইজেড ও ইউএনডিপির সহযোগিতার প্রশংসা করেন আইনমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুর হোসেন সভাপতিত্ব করেন। আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন। ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন যশোরের জেলা ও দায়রা জজ মাহমুদা খাতুন, কক্সবাজারের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবু সালেহ মোহাম্মদ নোমান, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার অভিজিৎ চৌধুরী এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুল মান্নান।

এদিকে, একই দিন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা হয়রানির জন্য দায়ের করা মামলাগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের মামলা কোনোভাবেই প্রত্যাহার করা হবে না বলে স্পষ্ট করেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা চিহ্নিত ও প্রত্যাহারের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটি কাজ করছে। যাচাই-বাছাই শেষে নিরপরাধ ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।