মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির সংকট চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও সরকারি সহায়তার নিশ্চয়তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংডং প্রদেশের স্থানীয় সরকারের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি দুটি ট্রাস্ট পণ্যের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে।
গত শুক্রবারের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
সোমবার পর্যন্ত আগের দুই দিনে চীনের করপোরেট বন্ডে বিনিয়োগ ধরে রাখতে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত গড় সুদের হার ১০ দশমিক ৩ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর দুই দিনের হিসাবে এটিই ছিল সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। তবে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে হুয়াফার মতো স্থানীয়ভাবে সর্বোচ্চ ‘এএএ’ রেটিং পাওয়া তিন বছর মেয়াদি ইউয়ান বন্ডের সুদের হারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
চীনের ৩৩০ মিটার উঁচু ঝুহাই টাওয়ারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণে ভূমিকা রাখা হুয়াফার বর্তমান সংকট দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ঝুঁকিকে সামনে নিয়ে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। তবে কয়েক বছর ধরে আবাসন খাতের মন্দা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কমছে।
গত সপ্তাহে হুয়াফার বিদেশি মুদ্রায় ইস্যু করা বন্ডের দামও ব্যাপকভাবে কমে যায়। একপর্যায়ে এসব বন্ডের দাম অভিহিত মূল্যের প্রায় ৫৪ শতাংশে নেমে আসে। প্রতিষ্ঠানটির সুদবাহী ঋণের পরিমাণ ৪১৩ বিলিয়ন ইউয়ান। বিপুল এই ঋণের বোঝা এবং অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিনিয়োগকারীরা বন্ড বিক্রি বাড়ান বলে মনে করা হচ্ছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক ঋণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্রেডিটসাইটসের এশিয়া ক্রেডিট কৌশল বিভাগের প্রধান জারলিনা জেং বলেন, স্থানীয় সরকারগুলোর অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল—এমন কিছু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি যেন বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকা টাইম বোমা।
হুয়াফার সংকটের প্রভাব চীনের অভ্যন্তরীণ ঋণবাজারের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। গত সপ্তাহে চীনের উচ্চ সুদের হারের ডলার বন্ডগুলো প্রায় এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ সপ্তাহ পার করে। একই সময়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ সরকারি ঋণবাজারেও চাপ তৈরি হয়। শুক্রবার ৩০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ফিউচার লেনদেনে বড় ধরনের দরপতন ঘটে, যা মার্চের পর এক দিনে সর্বোচ্চ পতন। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, হুয়াফার সংকট বিভিন্ন আর্থিক বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন সরকার সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়াতে সহায়ক মুদ্রানীতি অনুসরণ করেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারগুলোর ঋণসংক্রান্ত ঝুঁকি কমাতে বড় পরিসরে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে এতদিন এ ধরনের সংকটের ঝুঁকি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছিল। সে কারণে হুয়াফার বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় গুয়াংডং প্রদেশে হওয়ায় পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। চীনের প্রদেশগুলোর মধ্যে অর্থনীতির আকারে শীর্ষে থাকা গুয়াংডংয়ের একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বড় শিল্পগোষ্ঠী আর্থিক সংকটে পড়ায় স্থানীয় সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। হুয়াফার সংকট শেষ পর্যন্ত চীনের বৃহত্তর ঋণবাজার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
সূত্র: ব্লুমবার্গ