বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বগুড়ার শেরপুর পৌর এলাকায় ১৭ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে চলমান সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ প্রকল্পে কাজের ধীরগতির কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। প্রায় তিন থেকে চার মাস আগে সড়ক খুঁড়ে ড্রেন নির্মাণকাজ শুরু হলেও দীর্ঘ সময় ধরে তা অসমাপ্ত পড়ে রয়েছে। এতে শহরের অন্যতম ব্যস্ত সড়কটি এখন পরিণত হয়েছে কাদা, গর্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে। প্রায় প্রতিদিনই পথচারী ও যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে রিজিলিয়েন্ট আরবান অ্যান্ড টেরিটোরিয়াল ডেভেলপমেন্ট (জট:উচ) প্রকল্পের আওতায় পৌর এলাকায় রাস্তা কার্পেটিং, আরসিসি ড্রেন, ফুটপাত ও স্ট্রিটলাইট স্থাপনের বৃহৎ উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য ১৭ কোটি ২৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৮ টাকা ৪৬ পয়সা। গত বছরের ৩০ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, হাজিপুর থেকে ধুনট রোড মোড়ের তালতলা পর্যন্ত রাস্তার কার্পেটিং, আরসিসি সড়ক ও ড্রেন নির্মাণকাজের দায়িত্ব পেয়েছে পটুয়াখালী পৌরসভার কালিকাপুর এলাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এ ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড মিজানুর আলম জেভি। ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর শুরু হওয়া এ প্রকল্প ২০২৬ সালের ৯ নভেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু প্রকল্প শুরুর পর উল্লেখযোগ্য সময় পেরিয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। পৌরসভার কর্মকর্তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত মোট কাজের প্রায় ৫ শতাংশও শেষ হয়নি। বরং এক মাসেরও বেশি সময় আগে সড়কের পাশে ড্রেন খনন করে অধিকাংশ স্থানে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে পৌর শহরের খোন্দকারপাড়া ও গোসাইপাড়া ভূমি অফিসসংলগ্ন এলাকায়। সড়কের একপাশ দীর্ঘ সময় খোঁড়া থাকায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই কাদায় পিচ্ছিল হয়ে পড়ছে পথ। রাতের বেলায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে। এই সড়কের পাশেই রয়েছে সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয়, থানা, দুটি ভূমি অফিস, বিভিন্ন ক্লিনিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বড় বাজার, মসজিদ, অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবন। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করলেও নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা নেই। সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক জায়গায় ড্রেনের খননকাজ অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও কোথাও নির্মাণসামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কয়েকটি বাসাবাড়ির প্রবেশপথ খননের কারণে বাসিন্দাদের চলাচলে দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে। আবার কোথাও ড্রেনের পাশে মাটি সরে গিয়ে বাড়ির সীমানাপ্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পানি নিষ্কাশনও ব্যাহত হওয়ায় বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। গোসাইপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফারুক বলেন, ‘এটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। এখানে থানা, ভূমি অফিস, মসজিদসহ অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ড্রেন খোঁড়া অবস্থায় পড়ে আছে। মানুষ ও যানবাহন প্রায়ই ড্রেনে পড়ে দুর্ঘটনায় আহত হচ্ছে।’ তালতলা এলাকার বাসিন্দা তবিবর রহমান বলেন, ‘ঠিকাদার কাজ শুরু করে চলে গেছে। এখন রিকশাও ঠিকমতো চলতে পারে না। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি জানাই।’ স্থানীয় ব্যবসায়ী সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় দুই মাস ধরে ড্রেনের কাজ বন্ধ। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দোকানে ক্রেতা আসতে পারছেন না, রাস্তা পারাপারেও সমস্যা হচ্ছে।’ পৌরসভার একাধিক সূত্র জানায়, কাজের ধীরগতির বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে। পরে তিন দফা লিখিত তাগিদ দেওয়া হয়। এরপরও কাজের গতি না বাড়ায় সম্প্রতি চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এ ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড মিজানুর আলম জেভি-এর প্রতিনিধির মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। শেরপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) শফিকুল ইসলাম (শামিম) বলেন, ‘ঠিকাদারকে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য ইতোমধ্যে তিনটি লিখিত পত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সন্তোষজনক সাড়া না পাওয়ায় চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে।’ পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, ‘জনদুর্ভোগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। জনস্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু ও দ্রুত শেষ করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’