হাওর ও জলাভূমিতে মিঠাপানির দেশীয় মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে নতুন করে মাছের অভয়াশ্রম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। একইসঙ্গে জলমহালের প্রচলিত ইজারা ব্যবস্থা পরিবর্তন করে স্থানীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষায় নতুন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। শনিবার কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউট মিনি স্টেডিয়ামে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভেন্যু পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা জানানো হয়। মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, একসময় দেশের হাওর-বাঁওড়, নদী-নালা ও জলাভূমিতে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার, মাছের আবাসস্থল নষ্ট হওয়া এবং প্রাকৃতিক অভয়াশ্রম কমে যাওয়ায় মিঠাপানির দেশীয় মাছের প্রাচুর্য কমেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাওর ও জলাভূমিতে মাছের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকারি উদ্যোগে বড় গর্ত বা গভীর জলাধার তৈরি করে সেখানে মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। মাছের ডিম ও পোনা রক্ষা করা গেলে প্রাকৃতিকভাবে মাছের উৎপাদন বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিঠাপানির মাছের অভয়াশ্রম ভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হবে। মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। সমুদ্রের পানি ও সামুদ্রিক মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণা ও সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে জানান তিনি। একইসঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক বিষয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। মৎস্যসম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংসকারী ‘চায়নাদুয়ারি জাল’ বন্ধে সরকারি উদ্যোগ প্রসঙ্গে প্রাণিসম্পদমন্ত্রী বলেন, এসব জালে ছোট পোনা থেকে বড় মাছ, এমনকি বিভিন্ন জলজ প্রাণীও ধরা পড়ে। ফলে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও জলজ জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ধরনের জালের ব্যবহার বন্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ করা হলে সংশ্লিষ্ট মৎস্যজীবীদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়। এজন্য বিভিন্ন এলাকায় মৎস্যজীবীদের তালিকা করা হয়েছে এবং খাদ্যসহায়তা দেওয়া হচ্ছে। মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, আমরা চাই আবার মাছের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ঐতিহ্য ফিরে আসুক। হাওর, নদী ও জলাভূমিতে দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে। মন্ত্রী বলেন, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ এবং কৃষি ও মৎস্যসম্পদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে নতুন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের কাজ চলছে এবং পরবর্তী সময়ে সংসদে আইন উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী প্রজন্মের জন্য মৎস্যসম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার ও জনগণকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এর আগে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ এর কর্মসূচির প্রস্তুতি দেখতে সকালে মন্ত্রী পাকুন্দিয়া উপজেলার থানার ঘাট ঈশাখাঁ ব্রিজ সংলগ্ন পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ, বাহাদিয়া পাঠানবাড়ি ঘাট এবং মির্জাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন চেয়ারম্যান বাড়ি ঘাটে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ উপলক্ষ্যে পোনা মাছ অবমুক্তির সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি পোনা মাছ অবমুক্তির সার্বিক প্রস্তুতি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। পরিদর্শনকালে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, অতিরিক্ত সচিব সৈয়দা নওয়ারা জাহান, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক, কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রূপম দাস, কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজসহ মন্ত্রণালয়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং মৎস্য বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।