সিলেট অঞ্চলে—যতগুলো পাহাড় আছে তার সিংহভাগই আছে ভারতের সীমান্তের মেঘালয়ের অংশ কিন্তু কেন?
১৯৪৭ সালে যখন দেশভাগ হয়েছিল ভারত খুব সুনিপুণভাবে, চাতুরতার সাথে যতগুলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদে ভরপুর পাহাড় আছে সেগুলো তাদের নিজেদের অংশ করে নিয়েছে!
কয়েকদিন আগে সুনামগঞ্জের টাংগুয়ার হাওর ভ্রমণে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে বা আপনারা যারা সিলেট ভ্রমণ করেছেন তাদের সবার কাছেই এই জিনিসটা নিশ্চয়ই দৃষ্টিগোচর হয়েছে যে যতগুলো পাহাড় আছে তার সিংহভাগই আছে ভারতের সীমান্তের মেঘালয়ের অংশ। ব্যাপারটা অনেকটা এরকমই যে পাহাড় যেখানে শুরু হয়েছে আর সেখানে আমাদের বাংলাদেশের শেষ হয়েছে ।
এরকমটা দেখে মনে হতেই পারে যে ১৯৪৭ সালে যখন দেশভাগ হয়েছিল ভারত খুব সুনিপুণভাবে, চাতুরতার সাথে যতগুলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদে ভরপুর পাহাড় আছে সেগুলো তাদের নিজেদের অংশ করে নিয়েছে । কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন থেকেই যায় পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগের নেতৃত্ব কি তখন অতটা কার্যকর ছিল না? আসামের কংগ্রেস কি অনেক শক্তিশালী ছিলো!? কার্যত অর্থে মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ কি এসব অংশ পাকিস্তানের করে নেওয়ার নেগোসিয়েশনে ব্যর্থ ছিল?
উত্তরটা একই সাথে হ্যাঁ আবার না।
সিলেটের ভৌগোলিক ইতিহাস ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে দেখলাম, ১৫০০ সালের আশপাশে সিলেট শহর ও আশপাশে অথবা বৃহত্তর সিলেট, সেসময় গোর, লাউর, জয়ন্তিয়া, ত্রিপুরা, প্রতাবগর এসব রাজ্যের অধীনে ছিল । আবার, প্রাক-মধ্যযুগে এই অঞ্চল চন্দ্র, সেন ও দেব রাজবংশের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার আগে প্রাচীন বঙ্গ-হরিকেল ও কামরূপের হিন্দু ও বৌদ্ধ রাজাদের দ্বারা এটি শাসিত হতো। এই হিন্দু ও বৌদ্ধ রাজত্বের পতনের পরেই, বৃহত্তর সিলেট আরও অনেক স্বল্প ক্ষুদ্র রাজ্যের যেমন গৌড়, লাউড়, ইটা, তরফ এবং জৈন্তিয়ার রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। চতুর্দশ শতাব্দীতে সিলেটের বিজয়ের পরে অঞ্চলটি অধুনা পশ্চিমবঙ্গের লখনৌতিতে অবস্থিত শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ-এর স্বতন্ত্র রাজ্যত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, তখন এই অঞ্চল জালালাবাদ নামে পরিচিত হয়। এর পরে ১৫৭৬ সালে কররানী রাজবংশের পতনের পূর্বে, মুসলিম আফগান সর্দাররা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলিতে শাসন করত পরে তা দিল্লি ও শাহী বাংলার সুলতানদের দ্বারা ক্রমান্বয়ে শাসিত হয়েছিল। মুঘলরা সিলেটের সর্দারদের পরাজিত করতে লড়াই করেছিলেন।তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ খাজা উসমানের এবং সিলেট ও প্রতাপগড়ের সুলতান বায়োজিদ এর পরাজয়ের পরে এই অঞ্চলটি শেষ পর্যন্ত ১৬১২ সালে মোঘল শাসনের অধীনে আসে।
১৬১১-১২ সালের দিকে মুঘলরা সিলেট অঞ্চলকে কার্যকরভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ চালায় । এরপর সিলেট হয় বেঙ্গল সুবাহের একটি সরকার । তবে মুঘল আমলেও সিলেট মানে আজকের সিলেট জেলা অথবা বিভাগের সমান এলাকা ছিল না । এর পাশে আরেকটি অংশ ছিল জয়ন্তিয়া কিংডম নামে। ( বর্তমানে বেশিরভাগ অংশ মেঘালয়ে,রাজধানী ছিলো এখনকার সিলেটের জৈন্তাপুর) এই জয়ন্তিয়া কিংডম মুসলিম বাংলার অংশ হয়ে পুরোপুরি বিলীন হয়নি ।
এরপরে ব্রিটিশরা ১৭৬৫ সালে জয়ন্তীয় রাজাকে সিলেটের সমতল অঞ্চল থেকে সরিয়ে দেয় । কিন্তু পাহাড়ি জয়ন্তিয়া কিংডম আরো অনেকদিন স্বাধীন ছিল । শেষ পর্যন্ত ১৮৩৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জয়ন্তিয়া কিংডম সংযুক্ত করে । ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর সিলেট বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অংশই ছিলো। কিন্তু, ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশরা সিলেটকে বাংলা থেকে সরিয়ে Assam এর সঙ্গে যুক্ত করে। এর ফলে আজকের বৃহত্তর সিলেট তখন প্রায় পুরোটাই আসামের অংশ হয়।
এখানে একটা কথা আছে যে ব্রিটিশরা এই কাজটি কেনো করেছিলো?
মূল কারণ ছিল ব্রিটিশদের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ।এটা ১৯৪৭-এর মতো ধর্মভিত্তিক কোনো বিভাজন ছিল না।
১৮৭৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ সরকার Sylhet কে Bengal এর ঢাকা Division থেকে সরিয়ে নবগঠিত Chief Commissioner’s Province of Assamএর সঙ্গে যুক্ত করে। একই সময়ে Cachar, Goalpara এবং Garo Hills-এর কিছু অংশও Assam এর সঙ্গে যুক্ত হয়। এই Cachar,Goalpara এবং গারো হিলের বেশিরভাগ জায়গাই আজকের মেঘালয় রাজ্য।
পরে,১৯০৫–১৯১১ এ সময়ে বঙ্গভঙ্গের ফলে সিলেট আবার বৃহত্তর বাংলার নতুন প্রদেশের অংশ হয়। ১৯১১–১৯৪৭ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গ বাতিলের পর সিলেট আবার আসামে সংযুক্ত হয়।
——————————————–
১৯৪৭ সালের Partition পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় Louis Mountbatten এর নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ প্রশাসনের সামনে একটা সমস্যা ছিল।
এমন একজনকে বর্ডার তৈরি করার জন্য দরকার যিনি ভারতীয় রাজনীতির কোনো পক্ষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন এবং যাকে Congress ও Muslim League দুই পক্ষই তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ হিসেবে মেনে নিতে পারে।
ফাইনেস্ট চয়েস হিসেবে নাম আসে Sir Cyril Radcliffe। যার তৈরি করে দেওয়া ভারত-পাকিস্তান সীমান্তকে আমরা র্যাডক্লিফ লাইন বলি। তিনি ছিলেন লন্ডনের একজন বিশিষ্ট ব্রিটিশ ব্যারিস্টার এবং আইনজীবী। ভারতীয় ভূগোল, সমাজ বা রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ছিল খুব সীমিত। তাকে নেওয়ার মূল যুক্তিই ছিলো তার পলিটিকাল নিউট্রালিটি। তিনি ৮ জুলাই,১৯৪৭ সালের দিকে ভারত পৌছান এবং তার হাতে সময় ছিলো মাত্র ৫ সপ্তাহ। সীমান্ত নিয়ে সবচেয়ে ঝামেলার জায়গাগুলো ছিলো পাঞ্জাব,বাংলা এবং কাশ্মীর ( তখন রাজা হরিচন্দ্র কাশ্মির শাসন করছেন)।
পাঞ্জাব এবং বাংলার জন্য বাউন্ডারি কমিশন তৈরি হয়। যাতে প্রতিটিতে ২ জন মুসলিম বিচারপতি এবং ২ জন অমুসলিম বিচারপতি ছিলেন। ১৯৪৭ সালের Indian Independence Act অনুযায়ী বাংলা ভাগ হবে। সে আইনে বলা হয়েছিল সীমান্ত নির্ধারণের সময় বিশেষভাবে পাশাপাশি থাকা মুসলিম অধ্যুষিত ও অমুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চলকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এখন কথা হচ্ছে, সিলেট ১৯৪৭ সালে ছিলো আসামের অংশ। আসাম রাজ্যের বেশিরভাগ মানুষ ছিলো অমুসলিম আবার এদিকে বৃহত্তর সিলেট মুসলিমপ্রধান। এ সমস্যা সমাধানের জন্য ৬–৭ জুলাই ১৯৪৭ Sylhet Referendum (গণভোট) হয়।
ফলাফল:
East Bengal/Pakistan: 239,619
Assam/India: 184,041
কিন্তু এতেও সমস্যা বাঁধে করিমগঞ্জ (বর্তমান নাম শ্রীভূমি) কে নিয়ে। কারণ ম্যাপ ২ এ দেখেন, আসামের দক্ষিণ পূর্ব থেকে ত্রিপুরা যাওয়ার মাঝখানে করিমগঞ্জ পড়ে যায়।
মুসলিম লীগের রাজনীতিতে Assam নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল। বিশেষ করে Cabinet Mission Plan এর সময় Assam ও Bengal-কে একসঙ্গে Group C তে রাখার পরিকল্পনা হয়েছিল। এ প্ল্যান দিয়েছিলো আবার হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী। যাক,সেইটা ভিন্ন আলাপ। তবে Gopinath Bordoloi এর নেতৃত্বে Assam এর কংগ্রেস নেতৃত্বও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা Assam কে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত করার বিরোধিতা করেছিল। শেষ পর্যন্ত Partition-এর সময় Assam এর মূল ভূখণ্ড ভারতেই তেই থাকে, শুধু Sylhet-এর অধিকাংশ অংশ পূর্ব-বাংলায় যায়। যোগাযোগের সুবিধার কারণে, পরে করিমগঞ্জও আসামের অংশ হিসেবে ভারতের হয়।
আবার, Khasi/Jaintia Hills ও Assam-এ থেকে যায়। পরে 1972 সালে Assam-এর Khasi, Jaintia ও Garo পাহাড় নিয়ে Meghalaya State তৈরি হয়।
তবে,ব্যক্তিগতভাবে করিমগঞ্জ এবং মেঘালয়ের কিছু অংশ পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ প্রেশার দিলে নিতে পারতো বলেই আমার মনে হয়। জিন্নাহ আর লিয়াকত আলীর নজর লাহোর ( পাঞ্জাবের) প্রতি বেশি ছিলোও বলে অনেক লেখায় এসেছে। আবার এসব পাহাড়ি অঞ্চলের যোগাযোগ, অর্থনীতি আসামকেন্দ্রিকই বেশি ছিলো,পূর্বের রাস্তাঘাটও ওদিকটায় বেশি। এসবও অনেক বড় ফ্যাক্টর ছিলো। কিন্তু, করিমগঞ্জ টা জাতিগত ভাবেই সিলেটের পার্ট। আহ! মুসলিম লীগ!
ফারদিন মুগ্ধ 