মৃত্যুর পর দাফন ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া নিয়ে দিনভর জটিলতার পর অবশেষে দাফন করা হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে। গত শনিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নে নিজ বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়। সদর থানার ওসি শরিফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রয়াত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী ছিলেন মানিক পশারী। এ কারণে তার মৃত্যুর পর লাশ দাফন ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীরা তাকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে গার্ড অব অনার প্রদান ও পিরোজপুরে দাফনের বিরোধিতা করেন। মানিক পশারী (৮৭) পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মানিক পশারী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তার মেয়ের জামাইয়ের কাছে আশ্রয় নেন। গত দুই মাস ধরে তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। মৃত্যুর পর গত শনিবার দুপুরে তার লাশ পিরোজপুরে আনা হয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার জন্য লাশ সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নেওয়া হলে সেখানে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীরা জড়ো হন। এরপর লাশ দাফন ও গার্ড অব অনার দেওয়া নিয়ে বাধার সৃষ্টি হয় বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। পরিস্থিতি বিবেচনায় লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি পুলিশি পাহারায় পিরোজপুর পুলিশ লাইনে নেওয়া হয়। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সেখানে সাংবাদিকসহ অন্যদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। পরে পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। তবে কখন ও কোথায় তাকে এ সম্মান জানানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, লাশ দাফনের বিষয়ে প্রশাসনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়ায় তারা উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন। মানিক পশারীর মেয়ের জামাই ফারুক হোসেন জানান, দুপুর ১২টার দিকে তারা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইফতেখারুল ইসলাম শামীমের কাছে গেলে গার্ড অব অনারের কথা বলে বিকাল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়। দীর্ঘ সময় সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে লাশ রাখার পর গোপনে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এরপর লাশ কোথায় দাফন করা হবে, তা নিয়ে পরিবার অনিশ্চয়তায় পড়ে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের পর নিজ বাড়িতে দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় কিছু জামায়াত নেতাকর্মী ও সমর্থক আবারও জড়ো হয়ে বাধা দেন। পুলিশ লাইন থেকে শংকরপাশা যাওয়ার বিভিন্ন স্থানেও লোকজনের জড়ো হওয়ার খবর পাওয়া যায়। দিনভর অনিশ্চয়তা ও দাফন নিয়ে জটিলতার পর রাতে মানিক পশারীর স্ত্রী, মেয়ে, বোনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা নিজেরাই কবর খোঁড়ার কাজ শুরু করেন। রাত ২টার দিকে দাফন সম্পন্ন হয়। এ সময় স্থানীয় কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। মানিক পশারীর বোন মোছাম্মৎ রিনা আক্তার বলেন, আমার ভাইরে টুঙ্গিপাড়া দিয়া পিরোজপুর আনার পর ওখানে ঝামেলা হইছে। একবার মোরা কবর খুঁড়ছি, সেই কবর লোকজনে আবার ভরাট করে ফেলছে। আবার মোরা কবর খুঁড়ছি এবং পুলিশ লাশ আনার পরে মোরাই মাডি দিছি। কোনো পুরুষ মানুষ আয় নাই। এ বিষয়ে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মানিক পশারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাকে কোনোভাবেই গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না এবং পিরোজপুরের মাটিতে তার লাশ দাফন করতে দেওয়া হবে না। পিরোজপুর সদর থানার ওসি শরিফুল ইসলাম বলেন, মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইফতেখারুল ইসলাম শামীমও জানান, মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট পিরোজপুর থানায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা করেন মানিক পশারী। পরে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর বিরুদ্ধে চলা মূল মামলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।