কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে চুরি, ডাকাতি কিংবা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠলেই একদল মানুষ তাঁকে ঘিরে ধরে মারধর শুরু করছে। অনেক ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব কিংবা সামান্য সন্দেহ থেকেও সৃষ্টি হচ্ছে এমন ঘটনা। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গৎ মাসে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগে গণপিটুনির ৩৩টি ঘটনায় অন্তত ২২ জন নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে মব সহিংসতার ২২টি ঘটনায় একজন নিহত ও ৩৬ জন আহত হয়েছেন। এ ধরনের ঘটনার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। অপরাধের দ্রুত বিচার না হওয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থার ঘাটতি এবং বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকেই আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। আবার দেখা যাচ্ছে কোথাও কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ, জমিজমা নিয়ে বিরোধ কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিহিংসার কারণে কাউকে অপরাধী সাজিয়ে জনতার সামনে হেনস্তা করার ঘটনাও ঘটছে। আবার দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এখানে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, একবার কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে উত্তেজিত জনতা তৈরি হলে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। কোথাও উত্তেজিত জনতা কাউকে ঘিরে ধরেছেÑএমন খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে দ্রুত সেখানে পৌঁছে ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করতে হবে। শুধু ঘটনার পর মামলা ও গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; যারা উসকানি দেয়, গুজব ছড়ায় কিংবা পরিকল্পিতভাবে জনতাকে সহিংসতায় জড়ায়, তাদেরও শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে গণপিটুনির ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাও জরুরি। অপরাধের অভিযোগ তদন্তে দ্রুততা, মামলার নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি এবং অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা থেকে সরে আসবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অভিযোগ বা ভিডিও দেখেই উত্তেজিত না হওয়া এবং যাচাই ছাড়া তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। অপরাধীর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন, কিন্তু সেই শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব কোনো উত্তেজিত জনতার নয়। আজ সন্দেহের বশে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হলে কাল একই পরিণতি হতে পারে অন্য কারও। তাই গণপিটুনি ও মব সহিংসতাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে অপরাধ দমনের পাশাপাশি বিচার নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতার বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিতে হবে।