জানা নিউজ

‘সব বাধা পেরিয়ে এ বছরই দেশে ফিরব’, এনডিটিভিকে শেখ হাসিনা

বাংলাদেশে ফিরে আসার প্রত্যয় আবারও ব্যক্ত করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে নয়, দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই তিনি দেশে ফিরতে চান। তার ভাষায়, “সব বাধা ও সব ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে আমি এ বছরই আমার দেশে ফিরব।”

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের বিরুদ্ধে দেওয়া রায়, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, আসন্ন নির্বাচন এবং দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।

শেখ হাসিনার দাবি, তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় কোনো ন্যায়বিচারের ফল নয়, বরং এটি একটি “অবৈধ, অসাংবিধানিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার অংশ।” তিনি বলেন, “বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা যায়। অতীতেও এমন চেষ্টা হয়েছে, তখনও ব্যর্থ হয়েছে, এবারও হবে।”

তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা তাকে ভীত করে না। ১৯৭৫ সালে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হারানো এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার প্রসঙ্গ তুলে শেখ হাসিনা বলেন, “আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। সারাজীবন মানুষের জন্য রাজনীতি করেছি। পাঁচবার জনগণের ভোটে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছি। তাই সব বাধা পেরিয়ে আমি এ বছরই দেশে ফিরব।”

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, দলটি কাগুজে কোনো সংগঠন নয়, বরং বাংলার মাটি, মানুষের ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি রাজনৈতিক শক্তি। তিনি বলেন, “৭৭ বছরের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ বহুবার হামলার শিকার হয়েছে, বহুবার নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই জনগণের শক্তিতে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।”

তার দাবি, আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান অন্য কোনো দলের ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করছে না। “জনগণই আওয়ামী লীগের শক্তি। মানুষের সমর্থন নিয়েই আমরা দেশের উন্নয়ন করেছি। ষড়যন্ত্র করে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরানো গেলেও মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলা যায়নি।”

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, “দেশে গণতন্ত্র নেই, আইনের শাসন নেই, মানুষের নিরাপত্তা নেই। অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে। সংখ্যালঘুরা হামলার শিকার হচ্ছে, উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এবং আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা নজিরবিহীন নির্যাতনের মুখে পড়েছেন।”

আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো সরকার চাইলে একটি দলকে সাময়িকভাবে দমন করতে পারে, কার্যালয় বন্ধ করতে পারে বা নির্বাচনের বাইরে রাখতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে মুছে ফেলতে পারে না। তার দাবি, দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নে প্রতিদিন আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষও এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, “বর্তমান সরকারই প্রমাণ করেছে তারা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তিকে ভয় পায়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি ঠেকাতে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। এটি তাদের দুর্বলতারই প্রমাণ।”

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলো বাতিল, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। তার ভাষায়, “এগুলো কোনো অনুগ্রহ নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।”

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে পাকিস্তানের আদলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ তুলে শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে যে রাষ্ট্র গড়েছিলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেই ভিত্তির ওপর ধারাবাহিক আঘাত এসেছে।

তার অভিযোগ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ভাঙচুর, ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে অপরাধ হিসেবে দেখানো, বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে হামলা, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, মন্দির ও সুফি দরগায় হামলা এবং উগ্রবাদের বিস্তার দেশের মৌলিক চরিত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

অন্যদিকে নিজের সরকারের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ, মাথাপিছু আয় পৌঁছেছিল ২ হাজার ৭৯৩ মার্কিন ডলারে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ গুণ বেড়েছে, দারিদ্র্যের হার কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে এবং চরম দারিদ্র্য কমে হয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। তিনি পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ডিজিটাল বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট এবং কমিউনিটি ক্লিনিকসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কথাও উল্লেখ করেন।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, “সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা মানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ওপর হামলা।” তার অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, আহমদিয়া এবং সুফি সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন। মন্দির ভাঙচুর, বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট, চাঁদাবাজি এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, “সংখ্যালঘুরা কোনো ভোটব্যাংক নয়, তারা বাংলাদেশের সমান মর্যাদার নাগরিক। যারা মন্দিরে হামলা চালায় বা ধর্মের নামে মানুষকে ভয় দেখায়, তারা শুধু একটি সম্প্রদায়ের নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনারও শত্রু।”

শেখ হাসিনা আরও অভিযোগ করেন, সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে কথা বলায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে রাখা হয়েছে। তার মতে, সরকার পরিবর্তন হলেও সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।

বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে গোপন আলোচনার গুঞ্জনও উড়িয়ে দেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “গণতন্ত্র, ভোটাধিকার এবং ন্যায়বিচার কোনো গোপন দরকষাকষির বিষয় নয়। আওয়ামী লীগ কারও রাজনৈতিক দয়া চায় না। জনগণের সমর্থন ও সাংবিধানিক অধিকারের ভিত্তিতেই রাজনীতি করবে।”

নির্বাসিত জীবন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, বহু বছর ধরেই তার ব্যক্তিগত জীবন বলতে কিছু নেই। ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় নির্বাসনে কাটানোর স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমার হৃদয় বাংলাদেশেই পড়ে আছে। দেশের মানুষ, মাটি আর দলীয় নেতা কর্মীদের কষ্টের খবর প্রতিদিন শুনি। দূরে থেকেও দেশের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরার চেষ্টা করছি।”

আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলীয় নেতা কর্মীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনার বার্তা ছিল, “ঐক্যবদ্ধ থাকুন, মানুষের পাশে থাকুন। প্রতিটি গ্রাম, মহল্লা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করুন। প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও উন্নয়নের রাজনীতিই আওয়ামী লীগের পথ।”

সূত্র: এনডিটিভি