যুদ্ধকালীন বিভ্রান্তি ও সব পক্ষের প্রচারণার ভিড়ে কাকে বিশ্বাস করা উচিত, তা বোঝা কঠিন। তবে আলোচনার সম্ভাবনা এবং যুদ্ধ শেষ হলে কে কী লাভবান হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করলে কিছুটা পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে। ট্রাম্প বলেছেন, এক অজ্ঞাতনামা ‘উচ্চপদস্থ’ ইরানি ব্যক্তির সঙ্গে ‘খুব ভালো’ আলোচনার পর ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতা’ হয়েছে। এই মন্তব্যটি তিনি এমন সময় করেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রে সাপ্তাহিক শেয়ারবাজার লেনদেন শুরু হয়। ইরানের কাছে তিনি যে পাঁচ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, সেটিও সপ্তাহের লেনদেনের শেষের সঙ্গে মিলে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের লাভ কী?
দুই পক্ষই নিজেদের মতো করে বর্ণনা দিচ্ছে।
যদিও বাস্তবে বিশেষজ্ঞরা, এমনকি মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও এই সতর্কতা আগেই দিয়েছিলেন। এখন বাস্তবতা ট্রাম্পকে সেই ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, যা তিনি আগে উপেক্ষা করেছিলেন।
তার মিত্ররা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করলেও, ট্রাম্প অতীতে জটিল পরিস্থিতি থেকে বের হতে সমঝোতায় আগ্রহ দেখিয়েছেন। এখানেও তেমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি ইতোমধ্যে ইরানের কিছু তেল রপ্তানির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলো। ইরানের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা হরমুজ প্রণালীসহ বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে দিয়ে এই চাপ তৈরি করেছে।এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে আগেই অজনপ্রিয় ছিল, এখন তা আরও বেড়েছে। জ্বালানির দাম বাড়া এবং অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ার কারণে ভোটারদের অসন্তোষ বাড়ছে, বিশেষ করে আসন্ন কংগ্রেস নির্বাচনের আগে, যেখানে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানরা চাপে পড়তে পারে।
তাই ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ—যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য দেওয়া, অথবা যুদ্ধ শেষ করে সমালোচনার মুখে পড়া যে তিনি ‘স্বল্পমেয়াদি অভিযান’ সফলভাবে শেষ করতে পারেননি।
ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি
তবে ট্রাম্প যা-ই চান, সিদ্ধান্ত পুরোপুরি তার হাতে নয়। এক বছরেরও কম সময়ে দ্বিতীয়বার হামলার শিকার হওয়া ইরানের কাছে এখন যুদ্ধ শেষ করার আগ্রহ কম, যদি না ভবিষ্যতে এমন হামলা ঠেকানোর মতো কার্যকর প্রতিরোধ নিশ্চিত করা যায়।
আগের মতো সতর্কভাবে ধাপে ধাপে উত্তেজনা বাড়ানোর কৌশল এখন আর নেই। এই যুদ্ধে শুরু থেকেই দেখা গেছে, ইরান তাদের কৌশল বদলেছে এবং সংযম দেখাতে আগ্রহী নয়।
এখন ইরানের জন্য যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা এবং অঞ্চলে আরও চাপ সৃষ্টি করাও কৌশলগতভাবে লাভজনক হতে পারে, নিজেদের টিকে থাকার নিশ্চয়তা পেতে।
এছাড়া এমন ধারণাও থাকতে পারে যে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুদ কমে আসছে, ফলে ইরান আরও কার্যকরভাবে হামলা চালাতে পারছে। কট্টরপন্থীরা মনে করতে পারে, এখন থামার সময় নয়।
তবে ইরানও ক্ষতির মুখে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে ১৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও ঝুঁকিতে রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কও খারাপ হয়েছে, যা যুদ্ধের পর সহজে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ইরানের মধ্যপন্থী মহল মনে করতে পারে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তারা যুক্তি দিতে পারে, কিছুটা প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জিত হয়েছে, এখন আলোচনায় বসার সময়।
যদি তারা কিছু ছাড় আদায় করতে পারে, যেমন ভবিষ্যতে হামলা না করার নিশ্চয়তা বা হরমুজ প্রণালীতে বেশি নিয়ন্ত্রণ; তাহলে হয়তো তারা সমঝোতায় যেতে আগ্রহী হতে পারে।