সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ও তাঁর ছোট ভাই মাহের আল-আসাদকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দামেস্কের চতুর্থ ফৌজদারি আদালত অনুপস্থিতিতে এই রায় দেন। একই মামলায় মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন বাশারের মামাতো ভাই ও দারা প্রদেশের সাবেক রাজনৈতিক নিরাপত্তা প্রধান আতেফ নাজিবও।
সিরিয়ার ১৪ বছর ধরে চলা সংঘাতের সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের জন্য এই রায় দেওয়া হয়েছে। ওই সংঘাতে প্রায় ৫ লাখ মানুষ নিহত হন। আসাদ পরিবারের পাঁচ দশকের শাসনের অবসানের পর বাশার আল-আসাদ বা তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধে এটিই প্রথম মৃত্যুদণ্ডের রায়।
আদালতের শুনানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। বিচারক ফাখারেদ্দিন আল-আরিয়ান বলেন, বাশার আল-আসাদ যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করেছেন।
আতেফ নাজিবের বিরুদ্ধে অভিযোগের কেন্দ্রেও রয়েছে ২০১১ সালের দারা প্রদেশের দমন-পীড়ন। ওই সময় তিনি দক্ষিণ সিরিয়ার দারা প্রদেশে রাজনৈতিক নিরাপত্তা শাখার প্রধান ছিলেন। সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে তাঁর ভূমিকার কারণে তাঁকে দায়ী করা হয়েছে। ওই দমন-পীড়নই পরে ব্যাপক সরকারবিরোধী আন্দোলন ও গৃহযুদ্ধের অন্যতম সূচনা ঘটায়।
কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে আদালতে হাজির করা হয় নাজিবকে। কারাগারের পোশাক পরা অবস্থায় তাঁকে একটি খাঁচার মধ্যে রাখা হয়। পরে বিচারক তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় পড়ে শোনান। রায় ঘোষণার সময় দামেস্কের কেন্দ্রীয় আদালত ভবনের বাইরে মানুষের ভিড়ও দেখা যায়।
২০১১ সালে দারায় একটি স্কুলের দেয়ালে সরকারবিরোধী গ্রাফিতি লেখার অভিযোগে একদল কিশোরকে আটক ও নির্যাতন করা হয়েছিল। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিক্ষোভ দমনে সরকারি বাহিনীর কঠোর অবস্থান সিরিয়াজুড়ে বড় ধরনের আন্দোলনে রূপ নেয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ অস্ত্র হাতে তুলে নিলে শুরু হয় দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ।
মাহের আল-আসাদ ছিলেন সিরিয়ার সেনাবাহিনীর চতুর্থ সাঁজোয়া ডিভিশনের সাবেক কমান্ডার। সিরিয়ার বিরোধী পক্ষ তাঁর নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যা, নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও মাদক পাচারের অভিযোগ তুলেছিল। ওই বাহিনীর নিজস্ব আটককেন্দ্রও ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাশার আল-আসাদ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদ্রোহীদের হাতে সরকারের পতনের পর ছোট ভাই মাহেরকে নিয়ে সিরিয়া ছেড়ে রাশিয়ায় পালিয়ে যান। পরে তাঁরা রাশিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় পান। সিরিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষ দুই ভাইকে হস্তান্তরের জন্য রাশিয়ার কাছে অনুরোধ করেছে।
২০২৪ সালের শেষ দিকে বিদ্রোহীদের আকস্মিক অভিযানে বাশার সরকারের পতন ঘটে। ২৭ নভেম্বর হায়াত তাহরির আল-শামের নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা নতুন করে অভিযান শুরু করে। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তারা সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
৩০ নভেম্বর বিদ্রোহীরা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেপ্পোর নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর ৫ ডিসেম্বর হামা এবং ৭ ডিসেম্বর হোমস দখল করে তারা। একই সময়ে রাজধানী দামেস্কের কাছের দারা ও সুয়েইদার নিয়ন্ত্রণও সরকারি বাহিনীর হাতছাড়া হয়।
বিদ্রোহীদের দ্রুত অগ্রযাত্রার মধ্যে বাশার আল-আসাদ রাশিয়ার সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভর করার চেষ্টা করেন। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার সামরিক অগ্রাধিকার তখন অন্যদিকে ছিল। ফলে আগের মতো বড় ধরনের সহায়তা তিনি পাননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৭ ডিসেম্বর রাতে বাশার আল-আসাদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জালালির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। মাঠের পরিস্থিতির কথা জানানো হলে তিনি পরদিন বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু পরদিনই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে।
৮ ডিসেম্বর ভোরে বিদ্রোহীরা দামেস্কে ঢুকে পড়েন। এর আগে বাশার আল-আসাদ উড়োজাহাজে করে রাজধানী ছেড়ে লাতাকিয়ায় যান। সেখানকার একটি রুশ বিমানঘাঁটি থেকে তাঁকে মস্কোয় নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর দেশত্যাগ এতটাই আকস্মিক ছিল যে তাঁকে বহনকারী উড়োজাহাজটি রাডারে শনাক্ত করা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাশার আল-আসাদের পতনের মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে। তাঁর বাবা হাফিজ আল-আসাদ ১৯৭১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০০০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন বাশার আল-আসাদ।
ক্ষমতার শুরুতে বাশার কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও পরে তাঁর শাসনও কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। ২০১১ সালে আরব বসন্তের প্রভাবে সিরিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হলে তা কঠোরভাবে দমন করা হয়। সেই সংঘাতই শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।
সংঘাতের সময় সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটে। প্রায় ৫ লাখ মানুষ নিহত হওয়ার পাশাপাশি লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হন।
রাশিয়া ও ইরান দীর্ঘ সময় বাশার সরকারের প্রধান মিত্র হিসেবে সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তা দেয়। লেবাননের ইরানপন্থী সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহও বাশার সরকারের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেয়। ২০২০ সালের দিকে সরকারি বাহিনী আলেপ্পোসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করলেও সংঘাত পুরোপুরি থামেনি।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়ার সামরিক অগ্রাধিকার বদলে যায়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও আরও অস্থির হয়ে ওঠে। ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সংঘাত এবং ইরান-ইসরায়েল পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেও সিরিয়ার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক আলোচনার বাইরে চলে যেতে থাকে।
এরপর ২০২৪ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে বিদ্রোহীদের নতুন অভিযান সিরিয়াকে আবার আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। দ্রুতগতির সেই অভিযানের মুখে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি রাশিয়ায় পালিয়ে যান।
এখন সেই পতনের প্রায় দুই বছর পর তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আদালতের রায় এলো। তবে বাশার ও মাহের আল-আসাদ আদালতে উপস্থিত না থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে রায়টি অনুপস্থিতিতে দেওয়া হয়েছে।
{প্রতিবেদনটি তৈরিতে রয়টার্স, এএফপি, সিএনএন থেকেও তথ্য নেওয়া হয়েছে}