জানা নিউজ

জলাতঙ্ক। কুসংস্কার নয়, সচেতনতাই বাঁচাতে পারে জীবন

সম্পাদকীয়

জলাতঙ্ক প্রাণঘাতী একটি রোগ হলেও যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিলে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু রোগটি নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি, কুসংস্কার ও ভুল ধারণার কারণে প্রতিবছরই বহু মানুষ ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে ৪২ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে ৫৮ এবং ২০২৫ সালে ৫৯ জনে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসেই মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণের ঘটনায় কয়েক দিনের ব্যবধানে পাঁচজনের মৃত্যু জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। একই ঘটনায় নারী ও শিশুসহ আরও অনেকে আহত হন। এ ঘটনায় কোথাও টিকার সরবরাহ না থাকা, কোথাও সময়মতো টিকা না নেওয়া এবং চিকিৎসা পেতে দেরি করার বিষয়টিও সামনে আসে। শুধু রোগের ভয়াবহতা নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দুর্বলতাও এ ক্ষেত্রে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেশের কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে জলাতঙ্কের টিকার সংকট, টিকার ঘাটতির কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাইরে থেকে বেশি দামে টিকা কেনা এবং কোথাও কোথাও কয়েক মাস ধরে সরকারি সরবরাহ বন্ধ থাকার তথ্যও সামনে এসেছে। এ অবস্থায় দেশে চলমান কুসংস্কার ও ভুল ধারণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর অনেকে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে ঘরোয়া পদ্ধতি, ঝাড়ফুঁক বা নানা প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভর করেন, যা মৃত্যুর সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর কোনো ধরনের অপেক্ষা না করে ক্ষতস্থান সাবান ও পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়া ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা নিলে জলাতঙ্কে মৃত্যু সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। তবে শুধু মানুষকে সচেতন করলেই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না। জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে মানুষ ও প্রাণী-দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ২০২৪ সালের পর কুকুরের টিকাদান ও জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হওয়ায় জলাতঙ্কের ঝুঁকি বাড়ছে। যদিও সরকার জুন মাসে প্রায় ২০ লাখ ডোজ টিকা আমদানির উদ্যোগ এবং বেওয়ারিশ কুকুরের ব্যাপক টিকাদান ও বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। জলাতঙ্ক প্রতিরোধে তাই একদিকে মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে, অন্যদিকে আক্রান্তদের জন্য পর্যাপ্ত টিকা ও প্রয়োজনীয় প্রতিষেধকের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে টিকার মজুত ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে বেওয়ারিশ কুকুরের টিকাদান ও জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়মিত চালু রাখতে হবে। জলাতঙ্ক এমন একটি রোগ, যেখানে অসচেতনতা ও ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য অত্যন্ত ভয়াবহ। সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা, পর্যাপ্ত টিকার সরবরাহ এবং প্রাণী নিয়ন্ত্রণের সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই ভয়াবহ রোগ থেকে জনগণকে সুরক্ষা দিতে