জানা নিউজ

কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে নিহত ২৫৪, ধ্বংসস্তূপে চলছে মরিয়া উদ্ধার

কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৫৪ জনে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলের কালি, পেরেইরা, মানিজালেসসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ধসে পড়া ভবনের নিচে এখনও অনেকে আটকে থাকায় তৃতীয় দিনেও উদ্ধারকর্মীরা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন। আল জাজিরা জানিয়েছে, সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ২৫৪ জনে পৌঁছেছে।

সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। পশ্চিম কলম্বিয়ার কয়েকশ মাইল এলাকাজুড়ে এর কম্পন অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের পর মঙ্গলবারও বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক পরাঘাত অনুভূত হয়েছে। দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা।

ভূমিকম্পে হাজার হাজার বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু ভবন পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধসে পড়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয়ের হিসাবে, প্রায় ৫ হাজার বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে ভারী যন্ত্রপাতির পাশাপাশি শত শত স্বেচ্ছাসেবীও কাজ করছেন।

কালিতে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি

কলম্বিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম শহর কালি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। স্থানীয় সরকারের হিসাবে সেখানে অন্তত ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ৪৫টি স্থাপনা পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধসে পড়েছে।

শহরের একটি সাততলা আবাসিক ভবন পুরোপুরি ধসে পড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। উদ্ধারকারীরা হাতুড়ি, বেলচা ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন। ভবনটির নিচে প্রায় ২০ জন আটকা পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ধসে পড়া ভবনের পাশে একটি নার্সারি ছিল। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের ভাষ্য, সেখানে প্রায় ১৭ শিশু আটকা পড়ে থাকতে পারে। উদ্ধারকাজের সময় জীবিতদের কোনো শব্দ পাওয়া যায় কি না, তা শুনতে মাঝে মাঝে সবাইকে নীরব থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।

এক পর্যায়ে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শুনে একটি শিশু ও তার সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধারের চেষ্টা শুরু হয়। স্বেচ্ছাসেবীরা একসঙ্গে কংক্রিটের বড় একটি অংশ তুলে তাদের কাছে পৌঁছান। পরে শিশুটিকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়া হয়।

কালিতে লুটপাট ঠেকাতে রাতের বেলা কারফিউও জারি করা হয়েছে। শহরের মেয়র আলেহান্দ্রো এদের উদ্ধার তৎপরতা জোরদারে একটি কেন্দ্রীয় কমান্ড পোস্ট স্থাপন করেছেন। মঙ্গলবারও শহরটিতে কয়েক দফা কম্পন অনুভূত হয়। কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থার হিসাবে, মূল ভূমিকম্পের পর দেশজুড়ে ৭০টির বেশি পরাঘাত হয়েছে।

পেরেইরায়ও ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান

পেরেইরায়ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়াদের উদ্ধারে শত শত স্বেচ্ছাসেবী যোগ দিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, স্বেচ্ছাসেবীরা মানবশৃঙ্খল তৈরি করে ধ্বংসস্তূপ থেকে ছোট ছোট অংশ সরিয়ে নিচ্ছেন। উদ্ধারকারীদের অনেকে ভূমিকম্পের পর থেকে প্রায় বিরতিহীনভাবে কাজ করছেন।

পেরেইরার পারকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকার এক বাসিন্দা জানান, শহরের পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় এলাকায় চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। বলিভার স্কয়ারে অন্তত একটি ভবন ধসে পড়েছে। আরও কয়েকটি স্থাপনার নিচে বাস ও ট্রাক আটকা পড়েছে।

“আমরা সবাই হতবাক। ঘটনাটি সত্যিই ভয়াবহ ছিল,” বলেন ওই বাসিন্দা।

শহরটির ক্ষতিগ্রস্ত একটি আবাসিক ভবন থেকেও আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ চলছে। বিভিন্ন স্থান থেকে ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী দল এসে স্থানীয় কর্মীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে।

মানিজালেসেও ধস

মানিজালেস শহরেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। মেয়র হোর্হে এদুয়ার্দো রোহাস জানিয়েছেন, সেখানে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। ৬০টি ভবন পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধসে পড়েছে।

পরবর্তী পরাঘাত নিয়ে সতর্ক করে তিনি বাসিন্দাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যাচাই না করা তথ্য প্রচার না করার আহ্বান জানিয়েছেন। গুজব বা ভুল তথ্য আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

রাত কাটছে খোলা আকাশের নিচে

ভূমিকম্পের পর কালি, পেরেইরা এবং অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত শহরের বহু মানুষ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছেন। কারও বাড়ি ধসে পড়েছে, আবার কেউ ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কায় ঘরে ফেরেননি।

উদ্ধারকাজে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি রাজধানী বোগোতা ও দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মেডেলিন থেকেও ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে সহায়তা করছে।

কালিতে ধসে পড়া একটি ভবনের উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত ক্রেন ও খননযন্ত্র স্থানীয় নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ করেছে বলে উদ্ধারকাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

দুর্গম এলাকায় সহায়তা পৌঁছানো নিয়ে উদ্বেগ

ভূমিকম্পের কেন্দ্রের কাছাকাছি চোকো অঞ্চলের কিছু এলাকায় এখনও পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। দেশটির দরিদ্রতম অঞ্চলগুলোর একটি চোকোর একটি আদিবাসী সংস্থার নেতা জানিয়েছেন, তাদের এলাকার অনেক বাড়ি ধসে পড়েছে।

তিনি জানান, মানুষকে এখন বাইরে রাত কাটাতে হচ্ছে। খাবার ও ওষুধের প্রয়োজন রয়েছে। ওই এলাকায় পৌঁছাতে বুয়েনাভেনতুরা বন্দর থেকে নৌপথে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে।

এদিকে নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলার সরকারের জন্য ভূমিকম্পটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁকে এই দুর্যোগ মোকাবিলায় জাতীয় উদ্ধার তৎপরতার নেতৃত্ব দিতে হচ্ছে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য অর্থনৈতিক সহায়তা এবং ঘর হারানো পরিবারগুলোর অস্থায়ী বাসস্থানের জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রস্তাব

ভূমিকম্পের পর কলম্বিয়াকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র কলম্বিয়ার জনগণ ও সরকারের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন এবং উদ্ধার ও জরুরি সাড়াদানে সহায়তার কথা জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কলম্বিয়াকে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও তাদের কোপার্নিকাস স্যাটেলাইট সেবা সক্রিয় করেছে এবং উদ্ধার তৎপরতায় অর্থ সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে।

এ ছাড়া একুয়েডর, ব্রাজিল, এল সালভাদর ও ভেনেজুয়েলা কলম্বিয়াকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে মানুয়েল আলবারেস জানিয়েছেন, কলম্বিয়ায় থাকা ১৬৪ জন স্প্যানিশ নাগরিকের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা যায়নি। তবে এখন পর্যন্ত কোনো স্প্যানিশ নাগরিক নিহত বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

ভূমিকম্পের তৃতীয় দিনেও ধ্বংসস্তূপে জীবিতদের সন্ধান অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধারকারীরা আশাবাদী, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও কেউ জীবিত থাকলে দ্রুত তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।